যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে বসেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ; যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রতিনিধি এসে বলবেন নিজেদের কথা, তুলে ধরবেন সভ্ভতা, সংস্কৃতি ও এগিয়ে যাবার গল্প। আর আমরা ছুটছি একটি ডিমকে ভালোবেসে। হা, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের গায়ে ডিম ছুড়ে মারা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী হিসেবে যেসব রাজনীতিক জাতিসংঘের সাধারণ […]
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে বসেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ; যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রতিনিধি এসে বলবেন নিজেদের কথা, তুলে ধরবেন সভ্ভতা, সংস্কৃতি ও এগিয়ে যাবার গল্প। আর আমরা ছুটছি একটি ডিমকে ভালোবেসে। হা, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের গায়ে ডিম ছুড়ে মারা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী হিসেবে যেসব রাজনীতিক জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গেছেন, তাঁদের কেউ কেউ হেনস্তার শিকার হয়েছেন। । তাঁর হোটেলের লবিতেও আক্রমণের চেষ্টা হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারার উদ্দেশে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে। আমরা তীব্র ভাষায় এর নিন্দা জানাই।
অতীতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সরকারপ্রধানের যোগদান নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ঘটনা ঘটেছে। এক পক্ষ নিন্দাবাদ দিয়েছে, আরেক পক্ষ জিন্দাবাদ দিয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কারও ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি। এর মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তলানিতে এসে ঠেকল।
প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গীদের নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট অফিস ও দূতাবাস কর্মকর্তাদেরও দায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, তারা প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করবে। এই প্রেক্ষাপটে অতিথিদের যে ধরনের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল, সেটা হলো না কেন? সরকার যতই ব্যাখ্যা দিক বা দুঃখ প্রকাশ করুক, এ প্রশ্ন থেকেই যাবে।
হাঁস না মুরগির ডিম, সেটা জানা সম্ভব হয়নি, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ একটি ডিম বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, দেশে-বিদেশে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সামগ্রিক মর্যাদা ও সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বেহাল দশার চিত্রটি বড় করুণভাবে ফুটিয়ে তুলল। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এবং নোবেলজয়ী ড. ইউনুসের পক্ষেও তাঁর সরকারের এই চিত্রটি আর ঢেকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
তাঁরা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তাঁদের লক্ষ্যবস্তু করেননি। এমনকি এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারাকে লক্ষ্য করে উপস্থিত কয়েকজন অশ্রাব্য গালিগালাজের তুবড়ি ছুড়লেও তাঁকে শারীরিক হামলার শিকার করেননি। একটি হামলা চালাতে তাঁরা বেছে নেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে। মিজানুর রহমান নামে আওয়ামী লীগের এক কর্মী আখতারের পেছন থেকে একটি নিরীহ ডিম নিখুঁত নিশানায় ছুড়ে মারেন, যা আখতারের মাঝপিঠ বরাবর বিস্ফোরিত হয়।
স্রেফ ডিম বলেই রক্ষা। আখতারের শারীরিক কোনো ক্ষতি হয়নি, হওয়ার কথাও নয়। তবে তিনি মানসিকভাবে নিশ্চয় আহত হয়েছেন। দলীয় বিবেচনায় অবশ্য তাঁর কিছু রাজনৈতিক লাভ হলেও হতে পারে। তাঁর ওপর হামলার নিন্দায় এ মুহূর্তে সোচ্চার খোদ সরকার, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং তাঁর নিজের দল এনসিপি তো বটেই। এ হিসেবে আখতার হোসেনের রাজনৈতিক স্কোর নিশ্চয় অনেকখানি বেড়েছে।
সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁদের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে হয় এবং সব শেষ করে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে হেঁটে যেতে হয় আরও সাত মিনিটের রাস্তা। আর তারই সুযোগ নেন দেশে কার্যক্রম-নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নিউইয়র্কে বসবাসরত কর্মী-সমর্থকেরা।
প্রধান উপদেষ্টার একজন সফরসঙ্গীর ওপর এ রকম একটি হামলার সম্ভাবনা সম্পর্কে সরকার কী সচেতন ছিল না? আমরা তো জানি, এই কয়েক দিন আগে লন্ডন ও ওয়াশিংটনে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে কী পরিমাণ হেনস্তার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এরও আগে গত বছরের নভেম্বরে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিমানবন্দরের প্রবেশপথে হেনস্তা করা হয়েছিল।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির নেতারা নিজেরাও কী এ রকম একটি সম্ভাবনার বিষয়ে সতর্ক ছিলেন না?
নানা নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যাচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে বিশেষ প্রটোকল পাবেন—তাঁদের সে রকম ধারণা দিয়ে রাখা হয়েছিল। বসানো হয়েছিল, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গেই তাঁরা ভিভিআইপি এক্সিট দিয়ে বেরিয়ে নির্দিষ্ট হোটেলে চলে যাবেন।
জানা যাচ্ছে, বিমানবন্দরে অবতরণের পরপরই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ পাঁচ রাজনৈতিক নেতাকে আলাদা করে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ার জন্য সরিয়েও নেওয়া হয়। কিন্তু সরকারিভাবে তাঁদের ‘বিশেষ প্রটোকল’ দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা পাওয়া হলো না। কারণ, এখন জানা যাচ্ছে, এই নেতারা যে ক্যাটাগরির ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গেছেন, ভিসার সেই ধরন অনুযায়ী তাঁরা বিশেষ প্রটোকল পেতে পারেন না। ফলে নিউইয়র্ক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক নেতাদেরকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে একযোগে বেরোনোর অনুমতি দেয়নি। ফলে এই নেতাদের অপ্রস্তুতভাবে সাধারণ যাত্রীদের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে সাধারণ যাত্রীদের মতোই ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়, যাতে সময় লাগে এক ঘণ্টারও বেশি। সব কাজ শেষ করে তাঁরা যখন বেরিয়ে আসেন, ততোক্ষণে প্রধান উপদেষ্টার মোটরবহর তাঁদের ছেড়ে চলে গেছে বহুদূর।
সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁদের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে হয় এবং সব শেষ করে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে হেঁটে যেতে হয় আরও সাত মিনিটের রাস্তা। আর তারই সুযোগ নেন দেশে কার্যক্রম-নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নিউইয়র্কে বসবাসরত কর্মী-সমর্থকেরা।
প্রশ্ন হলো, এ আমাদের কেমন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যারা খোঁজ রাখে না, বিশেষ প্রটোকল পাওয়ার জন্য সরকার প্রধানের সফরসঙ্গীদের কী ধরনের ভিসা থাকা প্রয়োজন? এই ভিসার ব্যবস্থা করা কী তাদের জন্য খুব কঠিন ছিল? আর সেই ভিসা ছাড়াই যখন রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সে ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে তাঁদেরকে সাধারণ যাত্রীদের এক্সিট দিয়ে বেরোতে হবে এবং তখন তাঁদের হেনস্তার চেষ্টা হতে পারে—সে বিষয়টি তাঁরা বিবেচনায় রাখলেন না কেন এবং তা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে রাখা হলো না কেন?
অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার বিরাট লটবহর নিয়ে জাতিসংঘে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, নিরাপত্তা দল, কর্মকর্তাসহ এবার তাঁর সফরসঙ্গীর তালিকায় রয়েছেন ১০৪ জন। তবে সফরসংক্রান্ত পুস্তিকা অনুযায়ী এ সংখ্যা ৬২। বাকিরা কি সরকারের বাইরের কেউ?
রাজনৈতিক সরকারগুলোর সময়ে সাধারণত এ ধরনের সফরে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী ও পছন্দের লোকজন যেতেন। এ ছাড়া ব্যবসায়ীরাও নিজ খরচে সফরে যুক্ত হতেন। প্রধান উপদেষ্টাও সেই ধারা ফিরিয়ে আনলেন? গত বছর যেখানে তাঁর প্রতিনিধিদলে ৫৭ জন ছিলেন, সেখানে এবার প্রায় দ্বিগুণ করার কী কারণ থাকতে পারে? প্রধান উপদেষ্টার প্রেস টিমেরই পাঁচজন সদস্য নিউইয়র্কে গেছেন। এ নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে তাঁরা ক্ষুব্ধ হন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, অতীতে রাজনৈতিক সরকারের আমলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে ১৫০ থেকে ২০০ জন প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়েছেন। ২০১৪ সালে ১৮০ জন সফরসঙ্গী নিয়ে নিউইয়র্কে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৯ সালে ২৯২ জন সফরসঙ্গী নিয়ে নিউইয়র্কে যান তিনি। তবে ২০০৭-০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সফরসঙ্গীর কলেবর ছোট ছিল। প্রথমে জানানো হয়েছিল, প্রধান উপদেষ্টা মাত্র ১৪–১৫ জন প্রতিনিধি নিয়ে জাতিসংঘে যাবেন। সেটি সম্ভব হয়নি। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানালেন, নিরাপত্তাসহ কিছু বিষয় আছে, চাইলেও তা এড়ানো যায় না।
যাই হোক প্রসঙ্গে থাকি, নিউইয়র্কে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই সফর একটি রাজনৈতিক দায়িত্ব। পাশপাশি বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনার গল্প। তিনি এখানে বিশ্বের সামনে দেশের ছবি তুলে ধরেছেন—একটি দেশ যে নতুনভাবে দাঁড়াতে চায়, নতুনভাবে এগোতে চায়। প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন হবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা থাকবেন, সবার অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া গড়ে উঠবে। এই প্রতিশ্রুতি শুধু বিদেশি নেতাদের উদ্দেশে নয়, যেন বাংলাদেশের মানুষকেও শোনানো একটি বার্তা। নিউইয়র্কের রাস্তায় প্রবাসীরা এ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। কেউ বলছিলেন—“দেশে যদি সত্যিই সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তাহলে বিদেশে আমাদের মুখ উজ্জ্বল হবে।” কেউ আবার প্রশ্ন তুললেন—“কেবল প্রতিশ্রুতি দিলেই তো হবে না, বাস্তবে কী হবে?” কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, অসহনশীল প্রতিহিংসা মূলক এই রাজনৈতিক কালচারে ভবিষ্যত নির্বাচন কতটা নিরাপদ? পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর দেশ বাংলাদেশ। এত বড়ো জনগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ্র যে নীতিই বা আদর্শের হন, পুরো জাতিকে কি ছোট করতে পারেন? অথবা ভিন্ন নীতি বা আদর্শের প্রতি যতটাই ঘৃণা থাকুক, বহির বিশ্বে এমন কোনো রাজনৈতিক সংষ্কৃতি কতটাই যোক্তিক?