যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের হার দ্রুত কমছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে সহিংস অপরাধ এক বছরে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে, যা ১৯৩৬ সালে এফবিআই জাতীয় হিসাব রাখা শুরু করার পর সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন। তবে এই বড় পরিবর্তনের পেছনে ঠিক কোন কারণ সবচেয়ে বেশি কাজ করছে, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি অপরাধবিজ্ঞানীরা। এফবিআইয়ের তথ্য […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের হার দ্রুত কমছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে সহিংস অপরাধ এক বছরে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে, যা ১৯৩৬ সালে এফবিআই জাতীয় হিসাব রাখা শুরু করার পর সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন। তবে এই বড় পরিবর্তনের পেছনে ঠিক কোন কারণ সবচেয়ে বেশি কাজ করছে, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি অপরাধবিজ্ঞানীরা।
এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হত্যাকাণ্ড ও অনিচ্ছাকৃত হত্যার হার ১৮ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। প্রতি ১ লাখ মানুষের বিপরীতে হত্যার হার নেমে এসেছে ৪ দশমিক ১-এ, যা ১৯৫৫ ও ১৯৫৬ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ের সঙ্গে সমান। একই সময়ে ডাকাতি কমেছে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ, ধর্ষণ ৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং গুরুতর হামলা ৭ দশমিক ২ শতাংশ। সম্পত্তিবিষয়ক অপরাধও ১২ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে।
অপরাধ কমার এই প্রবণতা শুধু বড় শহরেই সীমাবদ্ধ নয়। এফবিআইয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় শহর, ছোট শহর, শহরতলি এবং গ্রামীণ এলাকাতেও সহিংস অপরাধ কমেছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেও দেশটির অনেক বড় শহরে এই পতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধ কমার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে গবেষকদের একটি অংশ মহামারির পর অ্যালকোহল ও মাদকের ব্যবহার কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আনছেন। সাবেক মার্কিন বিচার বিভাগের পরিসংখ্যানবিদ লিওনার্ড অ্যাডাম সাইপস জুনিয়রও মনে করেন, অ্যালকোহল ব্যবহারের পরিবর্তন এবং মানুষের গড় বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে অপরাধ কমার সম্পর্ক থাকতে পারে।
বিশেষ করে সহিংস অপরাধের সঙ্গে অ্যালকোহলের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণার বিষয়। মহামারির সময় জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও পরে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়েছে। এসব পরিবর্তনও অপরাধের প্রবণতায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
অপরাধ কমার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পুলিশের প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা অপরাধের প্রবণতা বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য অপরাধের হটস্পট শনাক্ত এবং সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করতে তথ্য বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
এআইভিত্তিক বিশ্লেষণ, ড্রোন এবং স্বয়ংক্রিয় লাইসেন্স প্লেট শনাক্তকারী প্রযুক্তি পুলিশি কার্যক্রমকে আরও দ্রুত ও লক্ষ্যভিত্তিক করতে সহায়তা করছে। তবে এসব প্রযুক্তি সাম্প্রতিক হওয়ায় দেশজুড়ে অপরাধ কমায় এর প্রকৃত প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণের জন্য আরও সময় ও গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষকেরা আরও একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন—যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যায় তরুণদের অনুপাত ধীরে ধীরে কমছে এবং গড় বয়স বাড়ছে। ঐতিহাসিকভাবে তরুণ বয়সী মানুষের মধ্যেই রাস্তার সহিংস অপরাধের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। ফলে জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জনসংখ্যার পরিবর্তন দিয়ে গত কয়েক বছরের এত দ্রুত অপরাধ কমার পুরো ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব নয়। বরং বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কারণ একসঙ্গে কাজ করছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ভেরা ইনস্টিটিউট অব জাস্টিসের প্রেসিডেন্ট ইনশা রহমান মনে করেন, অপরাধ কমার পেছনে মহামারি-পরবর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
শিকাগো, বাল্টিমোর, ডেট্রয়েট ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় পুলিশ ও সামাজিক কর্মীদের সমন্বিত কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের সুফলও সাম্প্রতিক অপরাধের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
ট্রাম্প প্রশাসন ওয়াশিংটন ডিসি ও মেমফিসের মতো শহরে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন এবং কঠোর আইন প্রয়োগকে অপরাধ কমার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের অনেকে এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন।
তাদের যুক্তি, যেসব শহরে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়নি কিংবা একই ধরনের কঠোর নীতি নেওয়া হয়নি, সেখানেও সহিংস অপরাধ কমেছে। এ ছাড়া অপরাধ কমার ধারা ২০২২ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রশাসনের আমলেও তা অব্যাহত রয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক পতনকে কোনো একটি সরকার বা একটি নীতির ফল হিসেবে দেখাকে বিশেষজ্ঞরা সতর্কতার সঙ্গে দেখছেন।
অপরাধবিষয়ক আলোচনায় আরেকটি নতুন সম্ভাবনা উঠে এসেছে। ওজেমপিকের মতো জিএলপি-১ শ্রেণির ওজন কমানোর ওষুধ অ্যালকোহল ব্যবহারের প্রবণতা এবং আকস্মিক আবেগপ্রসূত আচরণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণা চলছে।
তবে এই ধরনের ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধ কমার উল্লেখযোগ্য কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই। বিষয়টি বর্তমানে গবেষণার পর্যায়েই রয়েছে।
অপরাধ কমার এই প্রবণতা কতদিন স্থায়ী হবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মহামারি-পরবর্তী অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে যে বাড়তি অর্থায়ন করা হয়েছিল, তার একটি অংশ ভবিষ্যতে শেষ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে বা সামাজিক পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হলে অপরাধের সাম্প্রতিক নিম্নমুখী ধারা কতটা ধরে রাখা যাবে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের বর্তমান পতন একটি বিরল পরিবর্তন। কিন্তু এর পেছনে অ্যালকোহল ও মাদকের ব্যবহার কমা, জনসংখ্যার বয়স বাড়া, প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং, স্থানীয় পর্যায়ের সামাজিক কর্মসূচি কিংবা আরও কোনো কারণ—কোনটি কতটা ভূমিকা রাখছে, তার পূর্ণ উত্তর এখনো গবেষকদের হাতে নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সাম্প্রতিক অপরাধ পরিসংখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অপরাধ প্রবণতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: এফবিআই ও অ্যাক্সিওস