জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দেশের চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের জন্য সরকারের পরিকল্পনাহীনতা ও জ্বালানি ক্রয়ে সিদ্ধান্তহীনতাকে দায়ী করেছেন। সংকটের পেছনে ছয়টি কারণ তুলে ধরে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। বুধবার গণমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। নাহিদ ইসলামের দাবি, […]
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দেশের চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের জন্য সরকারের পরিকল্পনাহীনতা ও জ্বালানি ক্রয়ে সিদ্ধান্তহীনতাকে দায়ী করেছেন। সংকটের পেছনে ছয়টি কারণ তুলে ধরে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
বুধবার গণমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলামের দাবি, বিএনপি সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণের সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে। তার অভিযোগ, জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ বিতরণে বেসরকারিকরণের নামে নতুন করে অলিগার্ক গোষ্ঠী তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম তার বিবৃতিতে প্রথমে বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বর্তমান কর্মকাণ্ডের অসঙ্গতির কথা তুলে ধরেন। তার দাবি, বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ বিভিন্ন বিতর্কিত আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু সরকার এখন বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বাজারজাতের অনুমতি চাওয়ার পর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বিপিসিকে মাত্র চার দিনের মধ্যে নতুন নীতিমালার খসড়া তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বড় সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়ে প্রতিযোগিতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে নাহিদ দেশের বিদ্যুৎ খাতে অতীতের লোডশেডিং পরিস্থিতি ফিরে আসার কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে অতীতে যেভাবে বিদ্যুৎ খাত পরিচালিত হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
তৃতীয়ত, সরকারের অর্থসংকটের যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। নাহিদের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স পরিস্থিতি এমন নয় যে জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, মূল সমস্যা অর্থের অভাব নয়; বরং সময়মতো ক্রয় পরিকল্পনা ও শিডিউল অনুমোদনের ঘাটতি।
চতুর্থ কারণ হিসেবে তিনি জ্বালানি সংকটকে ‘উৎপাদিত সংকট’ বলে উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ, বিপিসিকে সময়মতো জ্বালানি আমদানির ক্রয় শিডিউল অনুমোদন না দেওয়ার কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এরপর সরকারি প্রতিষ্ঠানকে অক্ষম দেখিয়ে বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে জ্বালানি আমদানির সুযোগ তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পঞ্চম কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে একমাত্র দায়ী করার সরকারি বক্তব্যের সমালোচনা করেন নাহিদ। তার দাবি, যুদ্ধ শুরুর আগেই দেশে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং বেড়ে গিয়েছিল। তিনি পিজিসিবির তথ্য উল্লেখ করে বলেন, আগস্টে সর্বোচ্চ দৈনিক লোডশেডিং ৫৩ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছেছে। একই সময়ে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ছিল এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও কমে গেছে।
ষষ্ঠ কারণ হিসেবে তিনি মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনের ঘটনা তুলে ধরেন। তার দাবি, ২১ জুলাই ওই ঘটনায় দৈনিক প্রায় ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আংশিক সরবরাহ ফিরতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগে। এ ঘটনায় স্বাধীন কারিগরি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সংকট মোকাবিলায় আগামী ৩০ দিনের মধ্যে পাঁচটি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।
১. দ্রুত বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়া স্থগিত করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া।
২. আন্তর্জাতিক জ্বালানি দরপত্রের সময়সীমা ১০ দিন থেকে আবার ৪২ দিনে ফিরিয়ে আনা।
৩. বিপিসির সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর জ্বালানি ক্রয় শিডিউল দ্রুত অনুমোদন করা এবং আগামী চার থেকে ছয়টি প্রান্তিকের ক্রয় পরিকল্পনা প্রকাশ করা।
৪. মহেশখালী এফএসআরইউ দুর্ঘটনার স্বাধীন কারিগরি তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
৫. গ্যাস বরাদ্দে স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক অগ্রাধিকার ব্যবস্থা চালু করা, যাতে জ্বালানি-দক্ষ, রপ্তানিমুখী ও শ্রমঘন শিল্প অগ্রাধিকার পায়।
মধ্যমেয়াদে জ্বালানি খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন নাহিদ।
তার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিপিসির একচেটিয়া ব্যবস্থা ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র চালু, অপরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ দিয়ে দেশে রিফাইনারি সক্ষমতা বাড়ানো এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত শেষ করা।
এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা, অপ্রয়োজনীয় অর্থপ্রদান বন্ধ, আইপিপির বকেয়া নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসে স্মার্ট মিটারিং বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
নাহিদ আরও বলেছেন, এলপিজি খাতে প্রতিযোগিতা বাড়াতে নতুন প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দিতে হবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য এর দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মহেশখালীর বাইরে তৃতীয় ও চতুর্থ এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। পাশাপাশি সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি বা পিএসসি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কথা বলেছেন তিনি।
বাপেক্সকে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অভিজ্ঞ বিদেশি অংশীদার যুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে তার ১৫ দফায়।
সবশেষে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন নাহিদ। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, সৌর প্যানেল, কনভার্টার, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের শুল্ক কমানো বা শূন্যে আনার পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে হবে। বড় বাণিজ্যিক ও শিল্প ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বাধ্যতামূলক করার কথাও বলেছেন তিনি।
তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দৃশ্যমানভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জ্বালানি খাত শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। জ্বালানি খাতে ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর পড়ে। তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ নয়, সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করা।
তিনি আরও বলেন, অতীতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর প্রভাবের যে মূল্য দেশকে দিতে হয়েছে, সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া যাবে না। এনসিপি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যর্থতা, ভুল নীতি এবং অলিগার্ক গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।