যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজার ১৮২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছে, ১৯৯১ সালের পর কোনো এক বছরে এত বেশি হামের সংক্রমণ দেখা যায়নি। টিকা নেওয়ার হার কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে একাধিক প্রাদুর্ভাবের কারণে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মোট […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজার ১৮২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছে, ১৯৯১ সালের পর কোনো এক বছরে এত বেশি হামের সংক্রমণ দেখা যায়নি। টিকা নেওয়ার হার কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে একাধিক প্রাদুর্ভাবের কারণে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মোট আক্রান্তের মধ্যে ৪ হাজার ৯৯৩ জনের সংক্রমণ বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, শনাক্ত হওয়া মোট রোগীর প্রায় ৯৬ শতাংশই কোনো না কোনো প্রাদুর্ভাবের অংশ। এ বছর এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ৪৩টি নতুন প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া গেছে।
আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ১৮ শতাংশ এবং পাঁচ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু-কিশোর ৪১ শতাংশ। সব মিলিয়ে ২০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে সংক্রমণের হার প্রায় ৫৯ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের মধ্যে হামের টিকা নেওয়ার হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। সিডিসির হিসাবে, ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে কিন্ডারগার্টেনের শিশুদের মধ্যে হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধী এমএমআর টিকা নেওয়ার হার ছিল ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৪ শতাংশে।
সিডিসি বলছে, কোনো জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষ টিকা নিলে সাধারণত সামষ্টিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা হার্ড ইমিউনিটি বজায় থাকে। কিন্তু টিকা নেওয়ার হার কমে গেলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীর এমএমআর টিকার পূর্ণাঙ্গ নথি ছিল না।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ২ হাজার ২৮৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল। সেই হিসাবে চলতি বছরের সংক্রমণ গত বছরের মোট সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি।
হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। সিডিসির সর্বশেষ হিসাবে ২০২৬ সালে দেশটিতে হামে মৃত্যুর সংখ্যা চারজন। তবে অঙ্গরাজ্যগুলোর স্বাস্থ্য বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা আরও বেশি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পেনসিলভানিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগ ৬ নভেম্বর জানিয়েছে, চলতি বছর রাজ্যটিতে হামে আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৮৭ জনে। নিউইয়র্ক ও উইসকনসিনেও হামে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ফলে অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রকাশিত হিসাব যোগ করলে জাতীয় মৃত্যুর সংখ্যা সিডিসির হিসাবের চেয়ে বেশি দাঁড়ায়।
মৃত্যুর হিসাব নিয়ে পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরো এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মধ্যেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। পেনসিলভানিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগ নির্দিষ্ট মহামারিবিদ্যাগত মানদণ্ড অনুসরণ করে হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু শনাক্ত করে।
রাজ্যটির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির শরীরে হাম নিশ্চিত হওয়ার পর উপসর্গ শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হলে এবং মৃত্যুর কারণ অন্য কোনো সম্পর্কহীন ঘটনা না হলে সেটিকে হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নথি ও সংক্রমণের ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে পর্যালোচনা করা হয়।
সিডিসি জানিয়েছে, হামে মৃত্যুর হিসাব নির্ধারণে রাজ্য ও অঞ্চলগুলোর মধ্যে অভিন্ন সংজ্ঞা প্রতিষ্ঠার জন্য তারা কাউন্সিল অব স্টেট অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল এপিডেমিওলজিস্টসের সঙ্গে কাজ করছে। সংস্থাটির হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা পর্যালোচনা ও নতুন তথ্য পাওয়ার ভিত্তিতে পরিবর্তিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সালে হাম নির্মূলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর অর্থ, দেশটিতে তখন স্থানীয়ভাবে রোগটির নিয়মিত সংক্রমণ বন্ধ হয়েছিল; তবে বিদেশ থেকে সংক্রমিত ব্যক্তির মাধ্যমে নতুন করে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকা নেওয়ার হার কমে যাওয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণ বাড়ার কারণে দেশটিতে আবারও বড় প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এলাকায় টিকা নেওয়ার হার কমে গেলে সেখানে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণের মাধ্যমে ভাইরাস এক দেশ থেকে অন্য দেশেও পৌঁছাতে পারে। ফলে একটি অঞ্চলের টিকাদানের ঘাটতি হাজার হাজার মাইল দূরের জনগোষ্ঠীকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
সিডিসি বলছে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে অন্যরাও সংক্রমিত হতে পারেন। দুই ডোজ এমএমআর টিকা হাম প্রতিরোধে প্রায় ৯৭ শতাংশ কার্যকর। তাই রোগটি নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের হার বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: আল-জাজিরা, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং পেনসিলভানিয়া স্বাস্থ্য বিভাগ।