যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়ে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের দুই বছরের নীতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষকে এই পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়ে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের দুই বছরের নীতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষকে এই পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল বলছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ, ডেমোক্র্যাটদের সুসংগঠিত প্রচারণা, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনে পরিবর্তন রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিবিসির বিশ্লেষণে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবারের দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অসন্তোষ তৈরি হয় ভোটারদের মধ্যে।
নির্বাচনের আগে নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার বলেন, জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে মুদি পণ্য, সবকিছুর দামই বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি নিজের রাজনৈতিক সমর্থন রিপাবলিকান পার্টি থেকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দিকে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানান।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে পণ্যমূল্য ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছিল। জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্যও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ৫২ সেন্টের কাছাকাছি পৌঁছায়।
নির্বাচনের পর প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, ৭৯ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতি তাঁদের বা তাঁদের পরিবারের জন্য গুরুতর কিংবা মাঝারি ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি করেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের বেশি ভোটার এ পরিস্থিতির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক চাপ শুধু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই প্রভাব ফেলেনি, ভোটের সিদ্ধান্তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রিপাবলিকানদের পরাজয়ের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সংঘাতের প্রভাব মার্কিন অর্থনীতি ও জনমতেও পড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের পাল্টা পদক্ষেপে হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অচলাবস্থার কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
এর প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও। পেট্রোল পাম্পে বেশি অর্থ খরচ করতে হয় গাড়িচালকদের। ফলে আগে থেকেই জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন ভোটারদের অসন্তোষ আরও বাড়ে।
যুদ্ধটি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে মনে করেছেন তাঁর কিছু সমর্থক। ভবিষ্যতে নতুন যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত তাঁদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করে।
একটি জরিপে ৬৩ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মনে করেছেন। অন্যদিকে, ৭৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, যুদ্ধ ও সংঘাতের বিষয়টি কংগ্রেস নির্বাচনে তাঁদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বা সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা রেখেছে।
নির্বাচনের পরদিন সকালে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পও স্বীকার করেন, ইরান যুদ্ধ নির্বাচনে তাঁর দলের পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে তাঁর দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে আটকাতে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না।
রিপাবলিকানদের বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল তাঁদের প্রচারণার বার্তা ও প্রার্থীদের কৌশলগত অবস্থান।
ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার এবং সাধারণ পরিবারের আর্থিক চাপকে প্রচারণার কেন্দ্রে রেখেছিলেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রার্থীরা স্থানীয় সমস্যা ও ভোটারদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
সাবেক শিক্ষক জেমস টালারিকো এবং যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটন নিজেদের ধর্মীয় ও নৈতিক বিশ্বাসের বিষয়গুলো এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা টেক্সাস ও কানসাসের ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলে।
দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজের জয়ও ছিল উল্লেখযোগ্য। সাবেক এই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সাশ্রয়ী করার বিষয়টি প্রচারণায় গুরুত্ব দেন। দেশটির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তুষ্ট ভোটারদের কাছে তাঁর এই বার্তা গ্রহণযোগ্যতা পায়।
মিশিগানে জয়ী সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আব্দুল আল-সায়েদও মানুষের আর্থিক স্বস্তি ও রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানোর বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁর প্রচারণার মূল বার্তা ছিল, ‘রাজনীতি থেকে অর্থ সরাও, মানুষের পকেটে অর্থ দাও।’
জর্জিয়া থেকে পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের প্রচারণায়ও জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ট্রাম্প দুবার জয়ী হওয়া অঙ্গরাজ্যটিতে তাঁর বড় জয় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
এমনকি ট্রাম্পও নির্বাচনের পর ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসা করে বলেন, তাঁরা ‘বেশ ভালো কাজ করেছে।’
অন্যদিকে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোটারদের উদ্বেগ যথাযথভাবে গুরুত্ব না দেওয়া এবং দুর্বল প্রচারণা চালানোর অভিযোগ ওঠে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে ওঠে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া।
জ্বালানির উচ্চমূল্য, ইরান যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক চাপের মতো বিষয়গুলো সরাসরি প্রেসিডেন্টের নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় ভোটারদের অসন্তোষও তাঁর প্রশাসনের ওপর গিয়ে পড়ে।
এমনকি রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার সূচক কিছুটা কমে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া কিছু অঙ্গরাজ্য এবার রিপাবলিকানদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নিজের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আনতে ট্রাম্প ভোটারদের আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাঁরা যেন ব্যালটে তাঁকেই প্রার্থী হিসেবে কল্পনা করেন।
কিন্তু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক উপস্থিতি ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে নির্বাচনী সুবিধায় রূপ দেওয়ার কৌশল এবার প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বরং অর্থনীতি ও যুদ্ধ নিয়ে ক্ষুব্ধ ভোটারদের কাছে ট্রাম্পকে রিপাবলিকান প্রচারণার প্রধান মুখ করে তোলা উল্টো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যায়, অনেক আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যা, বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের দিকে আরও বেশি মনোযোগী দেখতে চেয়েছিলেন।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কিছু হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের সমর্থন পাওয়ায় ট্রাম্পের বিজয়ে সুবিধা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই সমর্থনের একটি অংশ আবার ডেমোক্র্যাটদের দিকে ফিরে গেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী হিস্পানিক অধ্যুষিত তিনটি কংগ্রেসনাল আসনেই ডেমোক্র্যাটরা জয় পেয়েছেন। এসব এলাকায় ভোটের পরিবর্তন রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় এবারের সিনেট নির্বাচনে হিস্পানিক-সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকানদের সমর্থন ২২ শতাংশেরও বেশি কমেছে।
ডেটা রিপোর্টার জেফ অ্যাডেলসনের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অন্যান্য প্রধান জনমিতিক গোষ্ঠীর তুলনায় হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে এই পরিবর্তন ছিল সবচেয়ে বেশি।
অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) অভিযান নিয়ে অসন্তোষ এ পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ৫৬ শতাংশ আমেরিকান আইসিই সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন।
শুধু হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যেই নয়, কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতেও সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে উল্লেখযোগ্য ভোট পরিবর্তন দেখা গেছে।
এতে বোঝা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে পড়া কিছু ভোটারগোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রাখতে দলটি এবার ব্যর্থ হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের ফলে রিপাবলিকানদের সামনে এখন দলীয় কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অর্থনীতি, অভিবাসন, পররাষ্ট্রনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ মোকাবিলা করা দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া ডেমোক্র্যাটদের সামনেও ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর করা যায়, তার ওপর আগামী দিনের রাজনৈতিক সমর্থন নির্ভর করতে পারে।
এই নির্বাচনের ফলাফল তাই শুধু রিপাবলিকানদের আসন হারানোর ঘটনা নয়; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভোটারদের অগ্রাধিকারের পরিবর্তনেরও প্রতিফলন।