নিউইয়র্ক সিটির গাড়িচালকদের ‘ধনী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন নগরীর পরিবহন কমিশনার মাইক ফ্লিন। ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানা, সড়কে বিনা মূল্যে পার্কিংয়ের সুবিধা এবং গাড়ি ব্যবহারের খরচ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর বক্তব্যের পর চালক ও তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) নিউইয়র্ক ল স্কুলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব বিষয়ে কথা […]
ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্ক সিটির গাড়িচালকদের ‘ধনী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন নগরীর পরিবহন কমিশনার মাইক ফ্লিন। ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানা, সড়কে বিনা মূল্যে পার্কিংয়ের সুবিধা এবং গাড়ি ব্যবহারের খরচ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর বক্তব্যের পর চালক ও তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) নিউইয়র্ক ল স্কুলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির প্রশাসনের পরিবহননীতির অংশ হিসেবে গণপরিবহন, সাইকেল চালানো ও হেঁটে চলাচলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরেন ফ্লিন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং শহরের সড়ক ও পার্কিংয়ের জায়গা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্লিন দাবি করেন, নগরীতে গাড়ির মালিকদের সম্পদ গাড়ি নেই এমন বাসিন্দাদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানাকে তিনি মূলত সচ্ছল মানুষের সুবিধা হিসেবে তুলে ধরেন এবং সরকারি সড়কে বিনা মূল্যে পার্কিংয়ের ব্যবস্থাকে জনসম্পদের ‘বিলিয়ে দেওয়া’ হিসেবে সমালোচনা করেন।
গাড়ির ওপর নির্ভরশীল বাসিন্দাদের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন
ফ্লিনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছে ব্রুকলিনভিত্তিক নাগরিক সংগঠন ব্রুকলিন৪অল। সংগঠনটিতে বাসযাত্রী, সাইকেলচালক, পাতালরেলের যাত্রী ও গাড়িচালকেরা রয়েছেন। তাদের মতে, শহরের সব বাসিন্দার যাতায়াতের প্রয়োজন এক রকম নয়। তাই ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানা বা ব্যবহারকে শুধু আর্থিক সচ্ছলতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা বাস্তব পরিস্থিতিকে যথাযথভাবে তুলে ধরে না।
সংগঠনটির এক মুখপাত্র বলেন, যাতায়াতের ক্ষেত্রে মানুষের জীবনযাপন ও প্রয়োজন অনুযায়ী পছন্দের স্বাধীনতা থাকা উচিত। তাঁর প্রশ্ন, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মানুষ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী যাতায়াতের মাধ্যম বেছে নিতে পারবেন না কেন?
ব্রুকলিন৪অলের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অনিয়মিত সময়ে কাজ করা কর্মীর জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি অপরিহার্য। কর্মস্থলে যাওয়া, সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার মতো দৈনন্দিন কাজেও অনেকে গাড়ির ওপর নির্ভর করেন। তাঁদের কাছে গাড়ি বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয় পরিবহনব্যবস্থা।
নিম্ন আয়ের মানুষের গাড়ির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায়
বিতর্কের মধ্যে ২০২৪ সালে হান্টার কলেজের একটি গবেষণা প্রতিবেদনের বিষয়ও সামনে এসেছে। ফ্লিন তাঁর বক্তব্যে ওই গবেষণার উল্লেখ করেন। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, মধ্যম ও উচ্চ আয়ের মানুষের তুলনায় নিম্ন আয়ের বাসিন্দাদের অনেক ক্ষেত্রে গাড়ির প্রয়োজন বেশি হতে পারে। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুযোগ বাড়াতেও গাড়ি ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, গাড়ির মালিকানার ক্ষেত্রে আয়, জাতিগত পরিচয় বা বয়সের চেয়ে আবাসনের ধরন ও কোন এলাকায় বসবাস করা হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্টেটেন আইল্যান্ডের প্রায় ৮৫ শতাংশ পরিবারের অন্তত একটি গাড়ি রয়েছে। কুইন্সে এ হার ৬৩ শতাংশ, ব্রুকলিনে ৪৫ শতাংশ, ব্রঙ্কসে ৪০ শতাংশ এবং ম্যানহাটনে ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে, একক পরিবারের বাড়িতে বসবাসকারীদের প্রায় ৮৭ শতাংশ এমন পরিবারে থাকেন, যেখানে গাড়ি রয়েছে। পাঁচ বা তার বেশি ইউনিটের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে বসবাসকারীদের ক্ষেত্রে এ হার ৩৩ শতাংশ।
তবে একই গবেষণায় ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানা আরও ব্যয়বহুল করা এবং পার্কিংয়ের সুবিধা সীমিত করার মতো কিছু নীতির সুপারিশও রয়েছে। এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হিসেবে অবসর বা বিনোদনের প্রয়োজনে গাড়ি ব্যবহার কমানোর কথা বলা হয়েছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে আরও এলাকায় সড়কে পার্কিংয়ের জন্য ফি চালু করা, গাড়ির মূল্যের ভিত্তিতে নিয়মিত নিবন্ধন ফি আরোপ এবং প্রতি মাইল গাড়ি চালানোর জন্য তিন সেন্ট করে চার্জ নেওয়ার প্রস্তাব।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে নিউইয়র্ক সিটির পরিবহন বিভাগও যুক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফি দিয়ে পার্কিংয়ের পরিধি বাড়ানোর চিন্তা
এদিকে নিউইয়র্ক সিটির পরিবহন বিভাগ আরও বেশি সড়কে মিটারভিত্তিক পার্কিং চালু করা এবং সময় ও চাহিদা অনুযায়ী পার্কিংয়ের ফি নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে ফ্লিন বলেছেন, এ ধরনের উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য রাজস্ব বাড়ানো হওয়া উচিত নয়; বরং শহরের সড়কের জায়গা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবহন বিভাগের নতুন ‘অফিস অব কার্ব ম্যানেজমেন্ট’ শহরের সড়কের পাশে থাকা জায়গাগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নত করার বিভিন্ন উপায় পর্যালোচনা করছে। এর মধ্যে পার্কিংয়ের জন্য ফি আরোপের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টিও রয়েছে।
ফ্লিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সিটির প্রায় ৩০ লাখ সড়ক-পার্কিং স্থানের ৯৭ শতাংশই বর্তমানে বিনা মূল্যে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করছে না। দীর্ঘ সময় বিনা মূল্যে গাড়ি পার্ক করে রাখার কারণে অন্য চালকদের পার্কিংয়ের জায়গা খুঁজে পেতে সমস্যা হয়। একই সঙ্গে পণ্য সরবরাহকারী কর্মী, রেস্তোরাঁ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিবহনসেবার গাড়িগুলোর জন্যও সড়কের পাশে জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ফ্লিন বলেন, কেউ বিশেষ প্রয়োজনে গাড়ি নিয়ে বের হলে যেন দীর্ঘ সময় ধরে পার্কিংয়ের জায়গা খুঁজতে না হয়। পণ্য সরবরাহের গাড়ির জন্য জায়গা নিশ্চিত করা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অ্যাকসেস-এ-রাইড পরিবহনসেবায় ওঠানামার সুযোগ করে দেওয়াও সড়কের জায়গা ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে তিনি স্বীকার করেন, নিউইয়র্কের সব এলাকার পরিস্থিতি এক নয়। কিছু এলাকায় বাসিন্দারা ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর বেশি নির্ভরশীল, আবার ঘনবসতিপূর্ণ ও গণপরিবহন-সুবিধাসম্পন্ন এলাকায় গাড়ির প্রয়োজন তুলনামূলক কম হতে পারে। তাই সব এলাকায় একই নীতি প্রয়োগ করা ঠিক হবে না।
পার্কিং ফি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
নিউইয়র্কের সাবেক ট্রাফিক বিভাগের প্রধান স্যাম শোয়ার্টজ মনে করেন, পার্কিংয়ের জন্য ফি আরোপের পরিধি বাড়িয়ে শহরের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হলেও নগর ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সড়কের জায়গার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা।
নাগরিক সংগঠন ওপেন প্ল্যানসের নির্বাহী পরিচালক সারা লিন্ডও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, পার্কিং ফি আরোপ সড়কের জায়গার চাহিদা নিয়ন্ত্রণ এবং পার্কিংয়ের সুযোগ বাড়ানোর একটি উপায়। এ থেকে রাজস্ব আসতে পারে, তবে সেটি মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়।
এর আগে সেন্টার ফর অ্যান আরবান ফিউচার নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউইয়র্ক সিটিতে আরও পার্কিং স্থানে ফি চালুর সুপারিশ করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, শহরের পার্কিং স্থানের আরও ২৫ শতাংশে ফি চালু করা গেলে বছরে অতিরিক্ত ১২১ কোটি ডলার রাজস্ব আসতে পারে। সময়ভেদে ফি পরিবর্তন এবং আবাসিক পার্কিং পারমিট চালুর প্রস্তাবও ছিল তাদের সুপারিশে।
তবে ব্রুকলিন৪অল মনে করে, গাড়ি ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে পার্কিংয়ের খরচ ও যাতায়াতের চাপ বাড়ানো হলে কর্মজীবী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো অন্যায্য আর্থিক বোঝার মুখে পড়তে পারে। সংগঠনটির মতে, গাড়ির ওপর নির্ভরশীল বাসিন্দাদের প্রয়োজন বিবেচনায় না নিয়ে নীতি প্রণয়ন করলে তা শহরের বিভিন্ন এলাকার মানুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো, গণপরিবহনের সুবিধা বাড়ানো এবং সড়কের জায়গার কার্যকর ব্যবস্থাপনা—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই নিউইয়র্কের পরিবহননীতি নিয়ে বিতর্ক চলছে। ফ্লিনের বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।