নিউইয়র্ক সিটির অভিবাসীবান্ধব বা ‘স্যাংচুয়ারি’ আইন চ্যালেঞ্জ করে ট্রাম্প প্রশাসনের দায়ের করা মামলা খারিজ করে দিয়েছেন একটি ফেডারেল আদালত। বৃহস্পতিবার দেওয়া এ রায়ে বলা হয়েছে, ফেডারেল অভিবাসন আইন বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে তাদের জনবল ও সম্পদ ব্যবহারে বাধ্য করা যায় না। রায়কে স্বাগত জানিয়ে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি বলেছেন, ভয় দেখিয়ে শহরের মানুষকে […]
নিউইয়র্ক সিটির অভিবাসীবান্ধব বা ‘স্যাংচুয়ারি’ আইন চ্যালেঞ্জ করে ট্রাম্প প্রশাসনের দায়ের করা মামলা খারিজ করে দিয়েছেন একটি ফেডারেল আদালত। বৃহস্পতিবার দেওয়া এ রায়ে বলা হয়েছে, ফেডারেল অভিবাসন আইন বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে তাদের জনবল ও সম্পদ ব্যবহারে বাধ্য করা যায় না। রায়কে স্বাগত জানিয়ে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি বলেছেন, ভয় দেখিয়ে শহরের মানুষকে বিভক্ত করতে সরকারকে তিনি দেবেন না।
আদালতের রায়ের পর এক বিবৃতিতে মামদানি বলেন, ফেডারেল সরকার নিউইয়র্ক সিটির সরকারি কর্মীদের অভিবাসীদের বহিষ্কারের কাজে নিয়োজিত করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিল। তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এ ধরনের কাজে শহরের কর্মীদের বাধ্য করার ক্ষমতা ফেডারেল সরকারের নেই।
অভিবাসীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া শহর ও অঙ্গরাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের করা মামলাগুলোর মধ্যে এটি ফেডারেল সরকারের আরেকটি পরাজয়। গত দুই বছরে লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো ও মিনেসোটার ফেডারেল আদালতেও একই ধরনের মামলা খারিজ হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের রায়ে যুক্তরাষ্ট্রের জেলা আদালতের বিচারক রামন ই. রেয়েস জুনিয়র বলেন, ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগে অঙ্গরাজ্যগুলোকে অংশ নিতে কিংবা ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করতে বাধ্য করার কোনো বিধান নেই।
বিচারকের মতে, দেওয়ানি অভিবাসন আইন কার্যকরে ফেডারেল কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করার জন্য নিউইয়র্ক সিটির বিভিন্ন সংস্থাকে তাদের নিজস্ব জনবল ও সম্পদ ব্যবহার করতে বাধ্য করা যায় না।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, নিউইয়র্কের স্থানীয় কর্মকর্তারা অভিবাসনবিষয়ক ফেডারেল নীতিমালা বাস্তবায়নে বেআইনিভাবে বাধা সৃষ্টি করছেন। তবে আদালত প্রশাসনের এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে মামলাটি খারিজ করে দেন।
‘স্যাংচুয়ারি’ বা অভিবাসীবান্ধব আইন বলতে এমন কিছু স্থানীয় নীতিমালাকে বোঝায়, যেগুলো দেওয়ানি অভিবাসন আইন কার্যকরের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও ফেডারেল সরকারের মধ্যে সহযোগিতার সীমা নির্ধারণ করে।
নিউইয়র্ক সিটির এসব আইনের আওতায় পুলিশ বিভাগের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা—আইসের (আইসিই) অনুরোধে অভিবাসীদের আটক রাখার ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ ও ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সাধারণ তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে।
মেয়র মামদানি বলেন, ফেডারেল সরকার আদালতের মাধ্যমে নিউইয়র্ক সিটির সরকারি কর্মীদের বহিষ্কার কার্যক্রমের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। একই সঙ্গে শহরের সম্পদ আইসের কঠোর অভিবাসননীতি বাস্তবায়নে ব্যয় করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মামদানির ভাষ্য, আদালত স্পষ্ট করেছেন, এ মামলা করার আইনি ভিত্তি ফেডারেল সরকারের নেই এবং নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণে শহরের কর্মীদের বাধ্য করা যাবে না।
তিনি বলেন, “আমাদের শহর আমাদের সবার। অমানবিক ও বিদেশিবিদ্বেষী কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের পরিত্যাগ করব না।”
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে প্রাথমিক অভিযোগপত্রে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছিল, নিউইয়র্কের অভিবাসীবান্ধব নীতির কারণে এমন কিছু অপরাধীকে শহরে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, যাঁদের অভিবাসন আইনের আওতায় বহিষ্কারের প্রক্রিয়ার জন্য আটক রাখা উচিত ছিল।
প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের এসব নীতি ফেডারেল অভিবাসন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। তবে আদালত সেই যুক্তি গ্রহণ করেননি এবং মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক সিটির অভিবাসীবান্ধব আইন নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে আইসের এক এজেন্ট ২৮ বছর বয়সী অস্কার বেলগালকে গুলি করেন। ঘটনার সময় তাঁর গাড়ির পেছনের আসনে তাঁর সন্তান ছিল। পরে আইস তাঁকে আটক করে।
ঘটনাস্থলে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (এনওয়াইপিডি) পৌঁছানোর পর বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের কঠোর আচরণ নিয়ে সমালোচনা হয়। বিক্ষোভের সময় পুলিশ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কংগ্রেস প্রার্থী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ারকে ধাক্কা দেয় বলেও অভিযোগ ওঠে।
শেভালিয়ারের অভিযোগ, পুলিশের এ আচরণ শহরের অভিবাসীবান্ধব আইনের মূল ভাবনার পরিপন্থী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি আইনের সরাসরি লঙ্ঘন না হলেও নীতিটির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবে নিউইয়র্কের পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গুলির ঘটনার আগে ফেডারেল অভিবাসন অভিযানটিতে এনওয়াইপিডি জড়িত ছিল না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রমাণ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছেছিল।
নিউইয়র্কে মামলায় পরাজয়ের মুখে পড়লেও ফেডারেল সরকার স্থানীয় পুলিশ বিভাগের সঙ্গে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়ানোর একটি কর্মসূচি সম্প্রসারণে অগ্রগতি অর্জন করছে।
‘২৮৭(জি) চুক্তি’ নামে পরিচিত এ কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগে সহায়তা করতে পারেন।
নিউইয়র্ক সিটিতে এ ধরনের কোনো চুক্তি নেই। তবে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এ কর্মসূচির বিস্তার দ্রুত বেড়েছে।
ফেডারেল আদালত নিউইয়র্কের অভিবাসীবান্ধব আইন সুরক্ষিত রাখায় স্থানীয় অভিবাসী অধিকারকর্মীরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
মামলায় আদালতে জমা দেওয়া একটি ‘অ্যামিকাস ব্রিফে’—অর্থাৎ আদালতকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে তৃতীয় পক্ষের দেওয়া লিখিত বক্তব্যে—অধিকারকর্মীরা বলেন, শহরের স্যাংচুয়ারি আইন অভিবাসীদের সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোর আস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাঁদের মতে, এসব নীতির কারণে অভিবাসীরা সরকারি সুবিধার জন্য আবেদন করতে, হাসপাতালে যেতে এবং গ্রেপ্তারের ভয় ছাড়াই পুলিশের সহায়তা চাইতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
বক্তব্যে অধিকারকর্মীরা আরও বলেন, বর্তমান প্রশাসনের সময় নিউইয়র্ক সিটির ফেডারেল দেওয়ানি অভিবাসন কার্যক্রমে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাঁদের অভিযোগ, এ প্রশাসন ব্যাপক মাত্রায় অভিবাসন অভিযান পরিচালনা করছে এবং এসব অভিযানের অনেক ক্ষেত্রে আইনবহির্ভূত, সহিংস ও অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ দেখা যাচ্ছে।
নিউইয়র্কের অভিবাসীবান্ধব আইন নিয়ে ফেডারেল সরকারের মামলা খারিজের রায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য আইনি স্বস্তি নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে অভিবাসন আইন বাস্তবায়নে ফেডারেল সরকারের ক্ষমতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের স্বাধীনতার সীমা নিয়ে বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে।