সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

ফিচার
৩:০৮ অপরাহ্ন, ২৫ জুন ২০২৬

ভারতে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান সংকট: নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য ও মানবাধিকার উদ্বেগ

ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা দিন দিন আরও অনিশ্চিত ও কঠিন হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হামলা, গ্রেপ্তার, সম্পত্তি ধ্বংস, ধর্মীয় স্থাপনায় আক্রমণ এবং সামাজিক বৈষম্যের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার সুপুরডিহি গ্রামের দরিদ্র বাসন বিক্রেতা আকবরের মৃত্যু […]

ভারতে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান সংকট: নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য ও মানবাধিকার উদ্বেগ

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ মিনিটে পড়ুন |

ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা দিন দিন আরও অনিশ্চিত ও কঠিন হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হামলা, গ্রেপ্তার, সম্পত্তি ধ্বংস, ধর্মীয় স্থাপনায় আক্রমণ এবং সামাজিক বৈষম্যের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার সুপুরডিহি গ্রামের দরিদ্র বাসন বিক্রেতা আকবরের মৃত্যু এবং একই জেলার আরেক মুসলিম নাগরিক মাইমুরের ওপর হামলার ঘটনা নতুন করে এই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। মাইমুর জানান, হামলার সময় তিনি আত্মরক্ষার জন্য আশ্রয় খুঁজছিলেন, কিন্তু কোথাও নিরাপত্তা পাবেন বলে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

তার ভাষায়, থানায় গেলেও সাহায্য পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না। পরে তিনি দাবি করেন, নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে পুলিশ তার বিরুদ্ধে উল্টো মামলা দায়ের করে। এই অভিজ্ঞতা তাকে বিশ্বাস করিয়েছে যে মুসলিম পরিচয়ই যেন তার জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।

বাড়ছে সহিংসতা ও ঘৃণামূলক অপরাধ

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণপিটুনি, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক হামলা এবং তথাকথিত গোরক্ষা বাহিনীর আক্রমণের ঘটনা নিয়মিত হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই অন্তত ২৭ জন মুসলিম সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

একই সময়ে মসজিদ, মাদরাসা, দরগাহ এবং কবরস্থানের মতো ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।

ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বাড়তি চাপ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা, প্রকাশ্যে নামাজ আদায়, মসজিদের মাইক ব্যবহারসহ বিভিন্ন ধর্মীয় চর্চাকে ঘিরে নানা বিধিনিষেধ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।

এছাড়া পাঠ্যপুস্তকে মুসলিম শাসকদের ইতিহাস কমিয়ে আনা, ঐতিহাসিক স্থান ও সড়কের নাম পরিবর্তন এবং রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের সংকোচন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

গবেষণা ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য

সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইনের ‘ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ১৭ জন মুসলিম নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন, আর বাকিরা নিহত হয়েছেন পুলিশি অভিযান বা হেফাজতে।

২০২৫ সালজুড়ে অন্তত ৫০টি মুসলিম হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। এর মধ্যে গণপিটুনি ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ২৭ জন এবং পুলিশি হেফাজতে ২৩ জন নিহত হন।

চরমপন্থী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দলের মতো সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে মুসলিমদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা ও হত্যার অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে এসব সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

পাহালগাম হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হাজার হাজার মুসলিমকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযানের অংশ হিসেবে অনেককে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনাও আলোচনায় আসে।

ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার অভিযোগ

গত কয়েক মাসে দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও হরিয়ানায় একাধিক মসজিদ, দরগাহ, ঈদগাহ ও মাদরাসা উচ্ছেদের অভিযোগ উঠেছে।

দিল্লির ঐতিহাসিক দরগাহ পঞ্চ পীরান, জয়পুরের নূরানি মসজিদ, মুম্বাইয়ের কয়েকটি দরগাহ এবং বারাণসীর গঞ্জ শাহিদা মসজিদ এই তালিকায় রয়েছে।

ওয়াকফ বোর্ড এবং স্থানীয় মুসলিম নেতারা অভিযোগ করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে আদালতের সিদ্ধান্ত বা যথাযথ নোটিশ ছাড়াই এসব স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি জেলায় মুসলিম বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহিংসতায় বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা এবং কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় মাংসের দোকান, গবাদিপশুর বাজার এবং মুসলিম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ভারতের কিছু রাজ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ ক্রমশ শাস্তিমূলক রূপ নিচ্ছে।

সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে বুলডোজার ব্যবহার, প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া এবং সম্পত্তি ধ্বংসের মতো কর্মকাণ্ড আইনের শাসনের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

সংস্থাটি আরও বলেছে, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পর মুসলিমদের বাড়িঘর ভাঙার ঘটনা অনেক ক্ষেত্রেই সম্মিলিত শাস্তির শামিল।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

মার্কিন মানবাধিকার কর্মী ও সাবেক রাষ্ট্রদূত স্টিফেন জে. র‍্যাপ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অনেক ঘটনার মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

তার মতে, নাগরিকত্ব প্রশ্ন, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং পুলিশি সহিংসতার মতো ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গভীর উদ্বেগের বিষয়।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ইতিহাসে রুয়ান্ডা, যুগোস্লাভিয়া কিংবা মিয়ানমারের মতো ঘটনাগুলোর শুরু হয়েছিল ঠিক এমন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্য দিয়েই।

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সমাজে যখন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা ঝুঁকি বা জনসংখ্যাগত হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা শুরু হয়, তখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

তাদের মতে, পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।

ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়; বরং এটি মানবাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং বহুত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ