রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা আওয়ামী লীগ আবারও রাজনীতিতে ফিরতে পারবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলটির নেতারা সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগের কথা বলায় এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘সমঝোতা’র সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেই আওয়ামী লীগ। তবে গত কয়েক মাসে […]
ছবি: সংগৃহীত
রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা আওয়ামী লীগ আবারও রাজনীতিতে ফিরতে পারবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলটির নেতারা সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগের কথা বলায় এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘সমঝোতা’র সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেই আওয়ামী লীগ। তবে গত কয়েক মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল করতে দেখা গেছে। এসব ঘটনায় অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। কোথাও কোথাও মিছিলকারীদের পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের হাতে মারধরের শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
গত ৫ আগস্ট ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ভাষণের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। এর মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পাশাপাশি গত ২৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের অন্যতম শরিক জাসদের কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানে ২৯০ জন সমর্থক আটকের ঘটনাও রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) ঘটনাটিকে বাংলাদেশে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ওপর আক্রমণের সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়।
এর মধ্যে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় যাওয়ার আগে প্রথম ও মৌলিক শর্ত হলো নিজেদের অপরাধের সুনির্দিষ্ট স্বীকৃতি দেওয়া এবং সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া। এই শর্ত পূরণ ছাড়া সমঝোতার প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি বলেন, কেউ যদি ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা সমঝোতা চান এবং এটিকে ভালো মনে করেন, তাহলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সেখান থেকে সমঝোতার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হলে আলোচনা হতে পারে। তবে একমুখী ও উসকানিমূলক পরিস্থিতিতে এ ধরনের আলোচনা এগিয়ে নেওয়া কার্যত অসম্ভব।
তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিকে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। তাদের ধারণা, এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে অন্য একটি পক্ষ বিষয়টিকে এতটা সরলভাবে দেখছে না। তাদের মতে, জুলাইয়ের ঘটনাবলির জন্য আওয়ামী লীগ অনুতপ্ত হবে কি না, সেটিই এখনো স্পষ্ট নয়। আবার দলটি অনুতপ্ত হলেও বিএনপি সরকারের সঙ্গে তাদের সমঝোতা হবে কি না, সেটিও নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থানের ওপর। বিশেষ করে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ জুলাইয়ের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলো এ বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগ এখনো অনুতাপ স্বীকার করেনি। তাঁর মতে, এ ধরনের অপরাধের পর শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে পারে না। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলছে এবং সেখানেই বিষয়টির ফয়সালা হওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্য, বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য একতরফাভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেই আওয়ামী লীগ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের পর ২০২৫ সালের ১১ মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরদিন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
একই সময়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনও বাতিল করা হয়। তবে দলটিকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। অন্যদিকে দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠন যুবলীগ নিষিদ্ধ রয়েছে।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পরও আওয়ামী লীগের ওপর রাজনৈতিক কার্যক্রমের নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল ওই অধ্যাদেশ ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস হয়। তবে এতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিধানে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি সরকার ভবিষ্যতে কোনো সমঝোতায় যাবে কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যেও এ বিষয়ে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে ক্ষমতাচ্যুত ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো জাতীয় সমঝোতা হতে পারে না। হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর ‘বিচার, জবাবদিহিতা ও জাতীয় সমঝোতা’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এ কথা বলেন।
অন্যদিকে তথ্য উপদেষ্টা বলেছেন, আওয়ামী লীগ নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে অনুতপ্ত হলে সমঝোতার আলোচনা হতে পারে। আবার গত ৫ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ২০২৪ সালেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে এবং এর দাফন হবে দিল্লিতে।
দলটির একাধিক নেতার এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে সরকারের অবস্থান নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারোয়ার তুষার।
তিনি বলেন, সরকার আওয়ামী লীগকে কীভাবে সমঝোতার মধ্যে আনতে চায়, সেটি আগে স্পষ্ট করা দরকার। কারণ সরকারের একেক নেতা একেক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। তাঁর দাবি, নির্বাচনি ইশতেহারে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা বলা হলেও এর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে বিএনপি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরকার সমঝোতা করবে কি না, সেটি পরের বিষয়। দলটির বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। বিচার শেষ হওয়ার পরই তাদের রাজনীতিতে ফেরার প্রশ্ন সামনে আসবে।
রাজনীতিতে ফিরতে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা নিয়ে এরই মধ্যে নানা ধরনের বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, পরিস্থিতির একপর্যায়ে দলটি নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে ক্ষমা চাইতে পারে। আবার অন্যদের ধারণা, আওয়ামী লীগ সহজে নতি স্বীকার করবে না।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগ ক্ষমা চাইবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে কোনো একপর্যায়ে দলটি নিজেদের অপরাধ স্বীকার করতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পেতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমের অভিযোগ, বিএনপি জুলাইয়ের শহীদদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং তাদের সাম্প্রতিক আচরণে তা স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর দাবি, বিএনপি বিভিন্নভাবে ফ্যাসিবাদকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং এ কারণেই জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি যদি পর্দার অন্তরালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা করে থাকে, সেটিকে পুরোপুরি অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য বিএনপিকেও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার প্রশ্নটি এখনো অনিশ্চিত। দলটির ওপর রাজনৈতিক কার্যক্রমের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা, চলমান বিচারিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণে ভবিষ্যতে কী ধরনের সমঝোতা বা রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।