ইরান নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনার ধরন ও পরবর্তী লক্ষ্য নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ দ্বন্দ্ব তাদের সামরিক পরিকল্পনায় লক্ষ্যবিস্তারের ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সাম্প্রতিক এই সংঘাতে যে সমস্যা সামনে এসেছে, তা হলো সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে মূল সীমা ছাড়িয়ে আরও […]
ছবি: সংগৃহীত
ইরান নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনার ধরন ও পরবর্তী লক্ষ্য নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ দ্বন্দ্ব তাদের সামরিক পরিকল্পনায় লক্ষ্যবিস্তারের ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক এই সংঘাতে যে সমস্যা সামনে এসেছে, তা হলো সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে মূল সীমা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হয়ে যাওয়া। গত কয়েক দশকে সুয়েজ, ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধেও এমন প্রবণতা দেখা গেছে। কোনো অভিযান যখন তার প্রাথমিক ম্যান্ডেট বা বাজেট ছাড়িয়ে বাড়তে থাকে, তখন সেটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নেয়।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তি ও সামরিক কমান্ডারকে হত্যার পর ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী অভ্যুত্থানের আহ্বান জানাতে নেতানিয়াহুর পরামর্শে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তখন স্পষ্ট করা হয়, ইরানে শাসন পরিবর্তন এই যুদ্ধের মূল পরিকল্পনার অংশ ছিল না। তবে ইসরায়েলের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ট্রাম্প নাকি নেতানিয়াহুকে ফোনে প্রশ্ন করেন, মানুষকে রাস্তায় নামতে বলার মানে কী, যদি তাদের পরে মারা যেতে হয়। এরপর দুই নেতা অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন, চাহারশানবে সুরি নামের ইরানি অগ্নি-উৎসবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয় কি না, তা দেখার জন্য।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দেন, যাতে ইরানের জনগণকে অগ্নি উৎসবের সময় রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করার ইঙ্গিত ছিল। এতে ওয়াশিংটনের অবস্থান আরও অস্বস্তিকর হয়ে পড়ে।
ট্রাম্পের দৃষ্টিতে এটি যুদ্ধের মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়া। হোয়াইট হাউসের ইঙ্গিত, ইরানে গণঅভ্যুত্থান ঘটানো বা শাসন পরিবর্তন তাদের ঘোষিত পরিকল্পনার অংশ নয়। কিন্তু জেরুজালেমের জন্য এটি কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সপ্তাহে ট্রাম্প কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের কাছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, পারমাণবিক সক্ষমতা, নৌবাহিনী এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন ভেঙে দেওয়ার কথা বলেন। তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি সরাসরি শাসন পরিবর্তনের কথা এড়িয়ে গেছেন।
এদিকে নেতানিয়াহু নাকি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের শীর্ষ লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, যুদ্ধ থামিয়ে ট্রাম্প কোনো চুক্তির পথে হাঁটতে পারেন—এই আশঙ্কা ইসরায়েলি নেতৃত্বকে তড়িঘড়ি পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করেছে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর দিয়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় সংঘাত দ্রুত শেষ হবে—ট্রাম্পের এমন ধারণা এখন আর স্থির নেই। যুক্তরাষ্ট্রও উপসাগরীয় এলাকায় অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের পথে যাচ্ছে, যা সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো লক্ষ্যবিস্তার। একবার কোনো সংঘাতে সেনা ও অস্ত্র মোতায়েন হলে, নতুন হুমকি সামলাতে পরিকল্পনা বারবার বদলাতে হয়। ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এমন যুদ্ধ সহজে নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই এখন ‘উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি ব্যবহার করলেও বাস্তবে তারা আরও কঠোর সামরিক কৌশলের দিকে ঝুঁকছে। তবে খুব কম ইসরায়েলি বিশ্লেষকই বিশ্বাস করেন, ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে পুরোনো সামরিক সতর্কবাণীটি আবার সামনে এসেছে—ব্যর্থতাকে আরও শক্তিশালী করা যাবে না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ধোঁয়াশায় যুদ্ধ যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তবে অভিযানের লক্ষ্য আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং ব্যর্থতাও গভীর হতে পারে।