দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ভয়াবহ বন্যা, ভূমিধস, রোগব্যাধি এবং খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি)। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আইআরসি জানিয়েছে, কেনিয়া, উগান্ডা, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের লাখো মানুষ এ […]
ছবি: সংগৃহীত
দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ভয়াবহ বন্যা, ভূমিধস, রোগব্যাধি এবং খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি)।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আইআরসি জানিয়েছে, কেনিয়া, উগান্ডা, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের লাখো মানুষ এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে চলমান মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ফলে ইতোমধ্যেই প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আইআরসির জরুরি পরিস্থিতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বব কিচেন বলেন, একাধিক মানবিক সংকট একই সময়ে তৈরি হচ্ছে। যেসব দেশের মানুষের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা আগে থেকেই সীমিত, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে।
সংস্থাটির মতে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। এর ফলে বাংলাদেশে বন্যা, ভূমিধস এবং অব্যাহত জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মানবিক সংকটও আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার জানায়, এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে এবং ১৯৫০ সালের পর এটিকে অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮১ শতাংশ। আবহাওয়াবিদদের ধারণা, এর সবচেয়ে বড় প্রভাব আগামী অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দেখা যেতে পারে।
এর আগে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছিল, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোকেও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইআরসি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সোমালিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি খরা, বাস্তুচ্যুতি এবং খাদ্য সংকটে ভুগতে থাকা দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৪৮ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
আইআরসি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ২০২৩ সালের বন্যায় সোমালিয়ায় প্রায় ১৩ হাজার টন কৃষিপণ্য নষ্ট হয়েছিল এবং বহু জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবার একই ধরনের বন্যা হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে, কারণ দেশটির মানুষ ইতোমধ্যেই খরা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের মুখে থাকা দেশগুলোর জনগণ আগে থেকেই সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য সংকট এবং মানবিক সহায়তা হ্রাসের কারণে চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে নতুন কোনো জলবায়ুগত দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার একটি স্বাভাবিক পরিবর্তন, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর ঘটে। স্বাভাবিক অবস্থায় বাণিজ্যিক বায়ু উষ্ণ পানিকে পশ্চিম দিকে ঠেলে রাখে। কিন্তু সেই বায়ু দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ পানি প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তিত হয়। এর ফলে কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও তীব্র খরা দেখা দেয়।
আবহাওয়াবিদদের মতে, চলতি বছরে ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রার পরিবর্তনও এল নিনোর প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আইআরসি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতি আগাম দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, দুর্যোগ আঘাত হানার আগে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে নগদ সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসামগ্রী এবং আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
চলতি মাসের ৫ জুলাই থেকে বাংলাদেশজুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের প্রথম ১১ দিনেই মাসজুড়ে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ হয়ে গেছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এবার নিম্নচাপের পাশাপাশি সক্রিয় মৌসুমি বায়ুও অতিবৃষ্টির অন্যতম কারণ। মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় এক সপ্তাহ দেরিতে দেশে প্রবেশ করলেও জুলাইয়ের শুরুতে তা দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং টানা বৃষ্টিপাতের সৃষ্টি করে।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ জানান, এবার বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের গতিপথও স্বাভাবিকের তুলনায় ভিন্ন ছিল। সাধারণত নিম্নচাপ খুলনা ও বরিশাল হয়ে দেশের মধ্যাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু এবার জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের দিকে প্রবাহিত হওয়ায় ওই এলাকায় বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এল নিনোর একটি বৈশিষ্ট্য হলো স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ঘটানো। যদিও দীর্ঘমেয়াদে এটি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক এলাকায় ভারী বৃষ্টির ঘটনাও দেখা যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি দফার বৃষ্টিতে দেশের এক লাখ হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি প্লাবিত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, এল নিনো পুরোপুরি সক্রিয় হলে দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ধানের উৎপাদন ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এতে খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক আরও উল্লেখ করেছে, ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপে রয়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।