যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি আলোচনা চললেও এই সংঘাত এখনো মার্কিন জনগণের সমর্থন আদায় করতে পারেনি। বরং যুদ্ধটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে উঠেছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগেই অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি আলোচনা চললেও এই সংঘাত এখনো মার্কিন জনগণের সমর্থন আদায় করতে পারেনি। বরং যুদ্ধটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে উঠেছে।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগেই অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার বিরোধিতা করেছিলেন। যুদ্ধ শুরুর পরও সেই অবস্থানের তেমন পরিবর্তন হয়নি। অনেক ভোটার এই সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর বলে মনে করছেন।
ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডের শান্তি ও উন্নয়ন বিষয়ক অধ্যাপক শিবলি তেলহামি বলেন, খুব কম আমেরিকানই বিশ্বাস করেন যে ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জনসমর্থনের এই ঘাটতি ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার আশা করছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৬ শতাংশ মার্কিন ভোটার মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জিতেছে বা জয়ের পথে রয়েছে। অন্যদিকে ৩৩ শতাংশের মতে, যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচকের চেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মাত্র ১২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন যুদ্ধের সুফল কুফলের চেয়ে বেশি।
শিবলি তেলহামির মতে, রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বাড়ছে, যা ট্রাম্পের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইরান ইসরায়েল ও আঞ্চলিক বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার প্রভাব পড়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে।
পরে ৬ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান এবং পাল্টা মার্কিন নৌ-অবরোধ এখনো বহাল রয়েছে।
ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার কৌশলকে সমর্থন করেন না। মাত্র ২৪ শতাংশ মনে করেন এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নিরাপদ করেছে।
একই সঙ্গে ৭৯ শতাংশ ভোটার বিশ্বাস করেন, যুদ্ধের কারণে দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ এখন শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; এটি সরাসরি মার্কিন নাগরিকদের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
সমালোচনার মুখেও ট্রাম্প নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকানোর জন্য প্রয়োজন হলে অর্থনৈতিক মূল্যও দিতে হবে।
সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “আমি মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ভাবি না। আমি শুধু একটি বিষয় নিয়ে ভাবি—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না।”
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে অর্থনৈতিক চাপ এবং জনঅসন্তোষ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। শিবলি তেলহামি বলেন, রিপাবলিকানরা যদি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে ট্রাম্পের বাকি মেয়াদ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে হামলার আগে ট্রাম্প প্রশাসন জনগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার কোনো বড় প্রচারণা চালায়নি।
শিবলি তেলহামি বলেন, ইরাক যুদ্ধের আগে যেমন দীর্ঘ সময় ধরে জনমত গঠন করা হয়েছিল, এবার তেমন কোনো প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। বরং ট্রাম্প নিজেকে দীর্ঘদিন ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছিলেন।
তার মতে, সেই অবস্থান থেকে সরাসরি যুদ্ধের পথে যাওয়ায় অনেক মার্কিন ভোটার বিভ্রান্ত ও অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছেন।
যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্তিতে প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপ ও বিশ্লেষণ বলছে, সামরিক সংঘাতের চেয়ে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।