যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর গত আট বছরে ইরান প্রায় ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করেছে। তবে চলমান সংঘাত ও মার্কিন হামলার পর এই বিশাল মজুত এখন কোথায় এবং কী অবস্থায় আছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে নতুন রহস্য। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। ইউরেনিয়াম স্বল্পমাত্রায় সমৃদ্ধ হলে তা বিদ্যুৎ […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর গত আট বছরে ইরান প্রায় ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করেছে। তবে চলমান সংঘাত ও মার্কিন হামলার পর এই বিশাল মজুত এখন কোথায় এবং কী অবস্থায় আছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে নতুন রহস্য।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। ইউরেনিয়াম স্বল্পমাত্রায় সমৃদ্ধ হলে তা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গবেষণার কাজে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার ২০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণে পৌঁছে গেলে ৬০ বা ৯০ শতাংশে যাওয়া তুলনামূলক দ্রুত ও সহজ হয়ে যায়।
ইরান ২০০৬ সালে শিল্প পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। দেশটি শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচির উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ধীরে ধীরে ইরানের মজুত বাড়তে থাকে।
২০১০ সালে তেহরান প্রথমবার ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ঘোষণা দেয়। ইরানের দাবি ছিল, গবেষণা চুল্লির জ্বালানি তৈরির জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে তখন থেকেই উদ্বেগ বাড়তে থাকে, কারণ ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হয়।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন আলোচনা শুরু করে। দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পর ২০১৫ সালে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয়টি বিশ্বশক্তির মধ্যে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখবে এবং মজুতের পরিমাণও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখবে।
চুক্তির আওতায় ইরান তার মজুত ৬৬০ পাউন্ডের নিচে নামিয়ে আনে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশটির কাছে অস্ত্রমানের কোনো ইউরেনিয়াম ছিল না বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু একই বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এরপরই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর ইরান ধীরে ধীরে সমৃদ্ধকরণের সীমা অতিক্রম করতে শুরু করে। প্রথমে সীমিত আকারে উৎপাদন বাড়ানো হলেও পরে ২০ শতাংশ এবং এরপর ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হয়। এই মাত্রা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশের খুব কাছাকাছি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পরবর্তীতে জো বাইডেন প্রশাসন পুরোনো চুক্তির কিছু অংশ পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করলেও আলোচনা সফল হয়নি। এরই মধ্যে ২০২৫ সালে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত আরও দ্রুত বাড়তে থাকে।
২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের সংঘাত চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নাতাঞ্জ ও ফোরদোতে অবস্থিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং ইস্পাহানের মজুত স্থাপনায় হামলা চালায়। এর কিছুদিন পর ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করে। ফলে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোথায় আছে। স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ চললেও সরাসরি পরিদর্শনের সুযোগ না থাকায় নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেজস্ক্রিয় ও রাসায়নিকভাবে বিপজ্জনক এই মজুতের কিছু অংশ হয়তো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বা গোপন স্থাপনায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে সেগুলো শনাক্ত করা কিংবা ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, ইরান ইস্পাহানের পাহাড়ি সুড়ঙ্গ এলাকায় নতুন গোপন সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র তৈরি করে থাকতে পারে। সেখানে মজুতের বড় অংশ রাখা হয়েছে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। যদি তা সত্যি হয়, তাহলে ইরানের গোপনে নতুন করে পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা এখনও থাকতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, ইরান যদি এই ইউরেনিয়াম পুনরুদ্ধার করতেও পারে, তা থেকে কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে আরও কয়েক মাস থেকে এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস