চলতি বছরের মে ও জুন—মাত্র দুই মাসে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে ইংল্যান্ডে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আগস্টেও তীব্র গরম অব্যাহত থাকলে ২০২২ সালের সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থা (UKHSA) জানিয়েছে, ২৪ থেকে ২৭ মে পর্যন্ত চলা তাপপ্রবাহে আনুমানিক ৭৫৩ জন এবং ২১ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে […]
চলতি বছরের মে ও জুন—মাত্র দুই মাসে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে ইংল্যান্ডে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আগস্টেও তীব্র গরম অব্যাহত থাকলে ২০২২ সালের সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থা (UKHSA) জানিয়েছে, ২৪ থেকে ২৭ মে পর্যন্ত চলা তাপপ্রবাহে আনুমানিক ৭৫৩ জন এবং ২১ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে আরও ২ হাজার ১২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে দুই মাসে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮৭৭ জন।
এর আগে ২০২২ সালে তাপপ্রবাহে ২ হাজার ৯৮৫ জনের মৃত্যুর রেকর্ড ছিল। চলতি বছরের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সেই সংখ্যাও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরমের কারণে ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দাবানল এবং তাপপ্রবাহজনিত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দমকল বাহিনীকেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বয়স্ক মানুষ, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং শারীরিকভাবে দুর্বল নাগরিকরা। চিকিৎসকদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় তীব্র গরমে থাকলে হৃদ্রোগ, শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা বেড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
বিশ্বের অনেক দেশে ৪৫ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাও দেখা গেলেও ইংল্যান্ডে তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় এত প্রাণহানির কারণ হিসেবে দেশটির আবহাওয়া ও অবকাঠামোগত বাস্তবতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বছরের বেশিরভাগ সময় শীতপ্রধান আবহাওয়ার কারণে ইংল্যান্ডের অধিকাংশ বাড়িতে পাখা বা এয়ার কন্ডিশনার নেই। অনেক ঘর শীত প্রতিরোধের উপযোগী করে নির্মিত হওয়ায় বায়ু চলাচলও সীমিত। ফলে তাপপ্রবাহের সময় ঘরের ভেতরেও তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।
ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (NHS) সচিব ইভেট কুপার বলেন, আগে শীতকালেই স্বাস্থ্যসেবার ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ত। এখন গ্রীষ্মকালও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়ার ধরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। গত দুই দশকে তাপপ্রবাহের মাত্রা ও স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বন্যার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মহাপরিচালক টেড্রস আধানম গেব্রিয়েসুস সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণায়নশীল মহাদেশ। অন্যদিকে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন ছিল পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুনগুলোর একটি।
চলতি বছর ২৬ মে ইংল্যান্ডে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ২৬ জুন তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। জুনের তাপপ্রবাহ টানা আট দিন স্থায়ী হয়েছিল এবং পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে দ্বিতীয়বারের মতো সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করতে হয়।
এদিকে তাপপ্রবাহের পাশাপাশি সাইক্লোস্পোরিয়াসিস নামের একটি সংক্রামক রোগ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত ৬৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই মেক্সিকো সফর শেষে দেশে ফিরেছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ইউরোপজুড়ে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা