Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

আন্তর্জাতিক
৪:৪৭ পিএম, ২০ জুন ২০২৬

কোটি টাকার নবজাতক বাণিজ্য: ভারতে শিশু পাচার চক্রের ভয়াবহ তথ্য উদ্ঘাটন

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নবজাতক শিশু কেনাবেচার একটি সংঘবদ্ধ আন্তঃরাজ্য চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে, একটি বেসরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে পরিচালিত এই নেটওয়ার্ক দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে শিশু সংগ্রহ করত, কখনও আবার শিশু চুরি করে এনে বিপুল অর্থের বিনিময়ে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে বিক্রি করত। পুলিশ জানিয়েছে, রাজস্থানসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নবজাতকদের দিল্লিতে আনা হতো। […]

কোটি টাকার নবজাতক বাণিজ্য: ভারতে শিশু পাচার চক্রের ভয়াবহ তথ্য উদ্ঘাটন

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ মিনিটে পড়ুন |

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নবজাতক শিশু কেনাবেচার একটি সংঘবদ্ধ আন্তঃরাজ্য চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে, একটি বেসরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে পরিচালিত এই নেটওয়ার্ক দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে শিশু সংগ্রহ করত, কখনও আবার শিশু চুরি করে এনে বিপুল অর্থের বিনিময়ে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে বিক্রি করত।

পুলিশ জানিয়েছে, রাজস্থানসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নবজাতকদের দিল্লিতে আনা হতো। এরপর জাল জন্মসনদ ও ভুয়া হাসপাতাল নথি তৈরি করে শিশুদের বৈধভাবে জন্ম নেওয়া বলে দেখানো হতো। পরে এসব শিশু মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো।

ঘটনার সূত্রপাত হয় দিল্লির পাহাড়গঞ্জ এলাকার এক বাসিন্দার অভিযোগের মাধ্যমে। তিনি পুলিশকে জানান, এক নারীকে নিয়মিত ভিন্ন ভিন্ন নবজাতক শিশুকে কোলে নিয়ে এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।

অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। তদন্তে জ্যোতি ওরফে কমলেশ নামে এক নারীকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে এক নারী পুলিশ সদস্য ক্রেতা সেজে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং শিশু কেনাবেচা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। চুক্তি অনুযায়ী অগ্রিম ২০ হাজার রুপি দেওয়ার কথাও হয়। অবশেষে ৫ জুন এক নবজাতক হস্তান্তরের সময় কমলেশকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে কমলেশ তার সহযোগী শালু, ললিত, প্রতিভা ও বিপিনের নাম প্রকাশ করেন। পরে পুলিশ তাদেরও আটক করে। অভিযুক্তদের কাছ থেকে প্রায় ৩ লাখ রুপি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধারাবাহিক অভিযানে এক মাসের কম বয়সী পাঁচ নবজাতককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

তদন্ত যত গভীরে গড়িয়েছে, ততই সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পশ্চিম দিল্লির রোহিণী এলাকার বেগমপুরে অবস্থিত হীরা মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালকে এই চক্রের মূল কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালের মালিক চিকিৎসক বিবেকী পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।

পুলিশের দাবি, শিশু পাচারকারীরা নবজাতকদের হাসপাতালে এনে রাখত এবং বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই তাদের রাখা হতো। পাশাপাশি হাসপাতাল থেকেই জাল জন্মসনদ, চিকিৎসা নথি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করা হতো, যাতে মনে হয় শিশুগুলোর জন্ম ওই হাসপাতালেই হয়েছে।

তদন্তে আরও জানা গেছে, কন্যাশিশু সাধারণত প্রায় ১ লাখ রুপিতে সংগ্রহ করে ৩ থেকে ৪ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হতো। অন্যদিকে ছেলেশিশু প্রায় ২ লাখ রুপিতে কিনে ৬ থেকে ৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হতো। ছেলে সন্তানের চাহিদা বেশি হওয়ায় তাদের মূল্যও তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

দিল্লি সেন্ট্রাল জেলার ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিং জানিয়েছেন, শিশু বিক্রির প্রায় সব লেনদেনই হাসপাতালকে কেন্দ্র করে সম্পন্ন হতো। চিকিৎসক বিবেকী ক্রেতা ও পাচারকারীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করতেন।

পরবর্তী অভিযানে গুজরাটের সবরকান্থা এলাকা থেকে সাবাভাই গামার ওরফে কালিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি রাজস্থানের বিভিন্ন দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে শিশু সংগ্রহ করতেন এবং পাচার চক্রের কাছে সরবরাহ করতেন।

বর্তমানে উদ্ধার হওয়া শিশুদের প্রকৃত পরিবার খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। পুলিশ তদন্ত করছে, শিশুগুলো পরিবার থেকে স্বেচ্ছায় বিক্রি করা হয়েছিল নাকি অপহরণ ও জোরপূর্বক পাচারের শিকার হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যদি কোনো অভিভাবক অর্থের বিনিময়ে সন্তান বিক্রি করে থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিশু ক্রয়কারী ব্যক্তিদেরও মামলার আওতায় আনা হতে পারে।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, গত এক বছরে এই চক্র অন্তত ৩০টি নবজাতক বিক্রি করেছে। ইতোমধ্যে হরিয়ানার পানিপথ এবং মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র থেকে কয়েকজন শিশুক্রেতাকে শনাক্ত ও আটক করা হয়েছে।

তদন্তে একটি প্রতারণার ঘটনাও সামনে এসেছে। এক দম্পতি একটি পুত্রসন্তান কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করলে চক্রটি তাদের জানায় যে শিশুটির একটি যমজ বোনও রয়েছে। পরে ৯ লাখ রুপির বিনিময়ে ওই দম্পতির কাছে কথিত যমজ শিশু বিক্রি করা হয়। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, দুটি শিশু ভিন্ন ভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিল না।

এই চক্র ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিন নারী পুলিশ কর্মকর্তা—সাব-ইন্সপেক্টর প্রগতি, সাব-ইন্সপেক্টর যামিনী এবং হেড কনস্টেবল সুষমা। তাদের বিশেষ অবদানের প্রশংসা করেছেন ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিং।

উদ্ধার হওয়া পাঁচ নবজাতককে বর্তমানে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। তাদের প্রকৃত অভিভাবকদের খুঁজে না পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ