Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

ফিচার
৩:৫১ পিএম, ২৩ মে ২০২৬

খুলনায় ‘বি কোম্পানি’ নামে ভয়ংকর মাফিয়া নেটওয়ার্কের বিস্তার

ভারতের অন্ধকার জগতের আলোচিত ‘ডি কোম্পানির’ আদলে খুলনায় নিঃশব্দে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর মাফিয়া নেটওয়ার্ক ‘বি কোম্পানি’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এই অপরাধ সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে রয়েছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী বাবু ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’। ২০১০ সালের আলোচিত জাহাঙ্গীর হোসেন কচি হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকলেও খুলনার অপরাধ জগত […]

খুলনায় ‘বি কোম্পানি’ নামে ভয়ংকর মাফিয়া নেটওয়ার্কের বিস্তার

ছবি: আমার দেশ স্পেশাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ মিনিটে পড়ুন |

ভারতের অন্ধকার জগতের আলোচিত ‘ডি কোম্পানির’ আদলে খুলনায় নিঃশব্দে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর মাফিয়া নেটওয়ার্ক ‘বি কোম্পানি’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এই অপরাধ সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে রয়েছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী বাবু ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’। ২০১০ সালের আলোচিত জাহাঙ্গীর হোসেন কচি হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকলেও খুলনার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছেন বলেই অভিযোগ রয়েছে।

খুলনায় একদিকে ধারাবাহিক খুন, চাঁদাবাজি, মাদক ও চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের মধ্যে চাল-ডাল বিতরণ, বিনামূল্যে শরবত খাওয়ানো ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেকে ‘গরিবের ত্রাতা’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন গ্রেনেড বাবু। স্থানীয়দের ভাষায়, এই দ্বৈত কৌশলের মাধ্যমেই নিজের অপরাধ সাম্রাজ্যকে আড়াল করছেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে খুলনায় সংঘটিত অন্তত ৬০টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ২১টির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ‘বি কোম্পানি’র সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

চলতি বছরের মার্চ মাসে খুলনায় সংঘটিত কয়েকটি বড় হত্যাকাণ্ডেও গ্রেনেড বাবুর অনুসারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। ৪ মার্চ ডাকবাংলো মোড়ে শ্রমিক দল নেতা মাসুম বিল্লাহকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর স্থানীয় জনতা এক শুটারকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তি স্বীকার করেন, গ্রেনেড বাবুর নির্দেশেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল।

এরপর কাস্টম ঘাটে ইমরান হত্যা এবং আদালত চত্বরে গুলি ও বোমা হামলার ঘটনাতেও ‘বি কোম্পানি’র কিলিং স্কোয়াডের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, “গ্রেনেড বাবু নামে যে পরিচিত, তার কোনো অস্তিত্ব খুলনা শহরে নেই। কেউ বলে সে মালয়েশিয়ায় থাকে, কেউ বলে ভারতে আধার কার্ড করেছে। তার অনুসারীরা এখানে কাজ করে। ওদের বিস্তৃতি মূলত রূপসা কেন্দ্রিক।”

গত বছরের জুন মাসে শামসুর রহমান রোডে গ্রেনেড বাবুর বাড়িতে যৌথবাহিনীর অভিযানে একটি ওয়ান শুটারগান, গুলি, বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি মুদ্রা, মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই উদ্ধার করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এটি ছিল তার অপরাধ সাম্রাজ্যের আর্থিক ও সাংগঠনিক শক্তির বড় প্রমাণ।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, কাস্টম ঘাট, চানমারি এবং ২২ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিতরণ করে নিজের অনুগত বলয় তৈরি করছেন গ্রেনেড বাবু। এসব কার্যক্রমের ভিডিও পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

গত এপ্রিলে শিববাড়ী মোড়ে ‘নবাবের পক্ষ থেকে’ বিনামূল্যে শরবত বিতরণের আয়োজন নিয়েও চাঞ্চল্য তৈরি হয়। গোয়েন্দাদের দাবি, ‘নবাব’ নামে পরিচিত ব্যক্তি আসলে গ্রেনেড বাবুরই আরেক পরিচয়। পরে সোনাডাঙ্গা মডেল থানা পুলিশ ওই স্থান থেকে ‘বি কোম্পানি’র সদস্য ও অস্ত্র মামলার আসামি মো. সাঈদুর এবং শরবতের ভ্যানচালককে আটক করে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনা ভারতে যাওয়ার পর খুলনার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয়েছে। মাদক, স্বর্ণ ও অস্ত্র চোরাচালানের রুট নিয়ন্ত্রণে নিতে গিয়ে গ্রেনেড বাবুর বাহিনী প্রতিপক্ষদের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে।

সম্প্রতি খুলনা জেলা কারাগারে গ্রেনেড বাবুর অনুসারীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী পলাশ গ্রুপের সংঘর্ষে অন্তত ১৪ থেকে ১৫ জন আহত হন। প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে কারা কর্তৃপক্ষকে পাগলা ঘণ্টা বাজাতে হয়।

এর প্রতিশোধ হিসেবে গত বছরের ৩০ নভেম্বর আদালতের প্রধান গেটের সামনে পলাশ বাহিনীর সদস্য হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করলেও তাদের গ্রেপ্তারে এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, বর্তমানে পুলিশের অনেক ইউনিট রাবার বুলেট ও লাঠি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে। বিপরীতে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সন্ত্রাসীরা সহজেই পালিয়ে যাচ্ছে।

খুলনা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একসময় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ‘রোহান’ ও ‘পলাশ’ গ্রুপ নামে কিশোর গ্যাং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করত। পরবর্তীতে সেই নেটওয়ার্ক ভেঙে বর্তমানে পলাশ বাহিনী, গ্রেনেড বাবু বাহিনী ও নুর আজিম বাহিনীসহ একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় হয়েছে।

এ ছাড়া দৌলতপুর এলাকায় চরমপন্থি হুমায়ুন কবীর হুমা, আরমান শেখ ওরফে আরমিন এবং নাসিমুল গণি ওরফে নাসিমের আলাদা বাহিনীও সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত নাসিম সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। একইভাবে আরমিনও হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়েছেন। তাদের মুক্তির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বর্তমানে গ্রেনেড বাবুর ‘বি কোম্পানি’সহ অন্তত সাতটি সন্ত্রাসী বাহিনী খুলনায় সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, এসব নেটওয়ার্কের অবস্থান শনাক্ত করতে বিশেষ টিম মাঠে কাজ করছে। তবে ত্রাণ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে গড়ে ওঠা এই অপরাধ সাম্রাজ্য ভেঙে দেওয়া এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: আমার দেশ স্পেশাল

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ