জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সব সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের পর তারা গণমাধ্যমে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন, যেখানে সদ্য বাতিল হওয়া অধ্যাদেশ, পুনর্বহাল হওয়া ২০০৯ সালের আইন এবং ভুক্তভোগীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর পাশাপাশি সদস্য নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিসের স্বাক্ষর […]
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সব সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের পর তারা গণমাধ্যমে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন, যেখানে সদ্য বাতিল হওয়া অধ্যাদেশ, পুনর্বহাল হওয়া ২০০৯ সালের আইন এবং ভুক্তভোগীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর পাশাপাশি সদস্য নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিসের স্বাক্ষর থাকা এই চিঠি রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
এর আগে জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল পাস হওয়ার মাধ্যমে পূর্বের অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে আওয়ামী লীগ আমলে প্রণীত ২০০৯ সালের আইন পুনরায় কার্যকর হয়। বিদায়ী কমিশনের দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে গুম, নির্যাতন ও রাজনৈতিক সহিংসতার ভুক্তভোগীদের জন্য একটি বড় ধরনের আইনি শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
খোলা চিঠিতে তারা বলেন, সংসদে অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে যেসব যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই তথ্যগতভাবে ভুল। বিশেষ করে গুমের শাস্তি, তদন্তের সময়সীমা, জরিমানা আদায় এবং বিচ্ছিন্ন গুমের বিচার নিয়ে সংসদে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তব আইনি কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে তারা দাবি করেন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বাতিল হওয়া অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রাভেদে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন বা অন্যান্য মেয়াদের কারাদণ্ডের বিধান ছিল। পাশাপাশি তদন্ত সম্পন্নের নির্দিষ্ট সময়সীমা, রিপোর্ট দাখিলে ব্যর্থ হলে শাস্তি এবং জরিমানা আদায়ের স্পষ্ট পদ্ধতিও নির্ধারিত ছিল। অথচ পুনর্বহাল হওয়া ২০০৯ সালের আইনে এসব বিষয়ে কার্যকর বিধান অনুপস্থিত।
বিদায়ী সদস্যরা আরও অভিযোগ করেন, নতুন বাস্তবতায় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের স্বাধীনতা কমিশন হারিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারলেও ২০০৯ সালের আইনে সেই ক্ষমতা সীমিত, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনী সংশ্লিষ্ট অভিযোগে। এতে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও সংকুচিত হবে বলে তারা মনে করছেন।
চিঠির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, সংসদীয় বিশেষ কমিটির আলোচনায় সরকারের প্রকৃত আপত্তির মূল লক্ষ্য ছিল কমিশনের আইনগত স্বাধীনতা খর্ব করা। এর মধ্যে কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীন আনা, তদন্তে সরকারি পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা এবং নিয়োগ কাঠামোয় নির্বাহী প্রভাব বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোকে তারা বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন।
ভবিষ্যৎ আইন প্রণয়নের বিষয়ে বিদায়ী কমিশনের সদস্যরা বলেন, পরামর্শের মাধ্যমে আইন আরও শক্তিশালী করার সুযোগ ছিল। কিন্তু অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের অপেক্ষাকৃত দুর্বল আইন ফিরিয়ে আনা ভুক্তভোগীদের জন্য হতাশাজনক বার্তা দিয়েছে। তাদের মতে, এখন মূল প্রশ্ন একটাই—নতুন আইন কি সত্যিই ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দেবে, নাকি আগের মতোই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বজায় থাকবে।
চিঠির শেষ অংশে তারা বলেন, গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের প্রশ্ন—“এখন আমাদের কী হবে?”—এর উত্তর কেবল আশ্বাসে নয়, একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর আইনি কাঠামোর মাধ্যমেই দিতে হবে।