জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউরোপের প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বতন্ত্র ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব (ইসলামিক থিওলজি) অনুষদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০২৭ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে নির্মাণাধীন ‘ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়নস’-এর অংশ হিসেবে এই নতুন অনুষদ চালু হবে। একই ক্যাম্পাসে ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মীয় অধ্যয়নও পরিচালিত হবে। ২০২১ সাল থেকে পশ্চিম জার্মানির মুনস্টার শহরে এই […]
ছবি: সংগৃহীত
জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউরোপের প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বতন্ত্র ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব (ইসলামিক থিওলজি) অনুষদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০২৭ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে নির্মাণাধীন ‘ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়নস’-এর অংশ হিসেবে এই নতুন অনুষদ চালু হবে। একই ক্যাম্পাসে ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মীয় অধ্যয়নও পরিচালিত হবে। ২০২১ সাল থেকে পশ্চিম জার্মানির মুনস্টার শহরে এই ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ চলছে।
জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নবগঠিত ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা ডিন মোহানাদ খোরশিদে এই উদ্যোগকে ইউরোপের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায়ের অংশ হতে পারা তার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১৫ বছরের কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকালে তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন।
খোরশিদে বলেন, “আমরা ইসলামের একটি উদার, আলোকিত ও মুক্তমনা ব্যাখ্যার পক্ষে কাজ করতে চাই। এমন একটি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব গড়ে তুলতে চাই, যা গবেষণানির্ভর, সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।”
তার মতে, এই অনুষদের প্রভাব শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইসলামিক থিওলজির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নতুন অনুষদ প্রতিষ্ঠার ফলে ইসলামিক থিওলজি এখন নিজস্বভাবে পিএইচডি এবং অন্যান্য উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রি প্রদান করতে পারবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গবেষণা তহবিল সংগ্রহ এবং বৃহৎ গবেষণা প্রকল্প পরিচালনার সুযোগও বাড়বে।
২০১২ সালে মাত্র ১৫ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ইসলামিক থিওলজি কেন্দ্রটি। বর্তমানে সেখানে আটজন অধ্যাপক এবং ৫০ জনেরও বেশি শিক্ষক, গবেষক ও কর্মকর্তা কাজ করছেন। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন খোরশিদে।
জার্মানির বিভিন্ন সরকারি বিদ্যালয়ে ইসলাম ধর্ম শিক্ষা চালু হওয়ার ফলে যোগ্য ইসলাম ধর্মের শিক্ষকের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। দেশটির সবচেয়ে জনবহুল অঙ্গরাজ্য নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়ায় বর্তমানে প্রায় তিন হাজার ইসলাম ধর্মের শিক্ষক প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৩৩০ জন। নতুন অনুষদ এই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৭ সাল থেকে ‘ইসলাম অ্যান্ড সোশ্যাল ওয়ার্ক’ নামে একটি নতুন স্নাতকোত্তর কোর্স চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এই কোর্সের মাধ্যমে যুব উন্নয়ন, হাসপাতালভিত্তিক ধর্মীয় পরামর্শসেবা, প্রবীণদের সহায়তা, সামাজিক কল্যাণ এবং বিভিন্ন জনসেবামূলক খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করা হবে।
নতুন অনুষদের শিক্ষানীতিতে ইসলাম ও গণতন্ত্রের সামঞ্জস্য, কোরআনের সমকালীন ও গবেষণাভিত্তিক ব্যাখ্যা, আন্তধর্মীয় সংলাপ এবং বহুত্ববাদকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চরমপন্থা, ইসলামবাদের রাজনৈতিক অপব্যবহার এবং ইহুদিবিদ্বেষের বিরোধিতাও নীতিমালায় স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খোরশিদে জানান, নতুন অনুষদের ঘোষণা প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “মানুষ একটি মুক্তমনা ও সমকালীন ইসলামের আকাঙ্ক্ষা করে। আমরা বিশ্বাস করি, দীর্ঘমেয়াদে মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জার্মানিতেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিসরেও ইসলামি ধর্মতত্ত্বের নতুন দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র নরবার্ট রবার্স বলেন, একই ছাদের নিচে খ্রিস্টান ও ইসলামিক ধর্মতত্ত্বকে একত্রিত করার এই উদ্যোগের প্রতীকী গুরুত্ব অত্যন্ত বড়। এটি শুধু একাডেমিক নয়, বরং বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সংলাপের ক্ষেত্রও আরও শক্তিশালী করবে।
জার্মানির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী আনেত্তে শাভান এই উদ্যোগকে ইউরোপীয় উচ্চশিক্ষার জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এই অনুষদ ইউরোপজুড়ে একাডেমিক ধর্মতত্ত্বের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং আধুনিক সমাজে ধর্মীয় শিক্ষা ও গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।