ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক যৌথ হামলার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। এতে বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। কারণ, বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বড় […]
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক যৌথ হামলার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। এতে বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। কারণ, বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর।
প্রতি মাসে প্রোডাক্ট অয়েল, ক্রুড অয়েল, এলপিজি ও এলএনজি বহনকারী অন্তত ১৫টি জাহাজ বাংলাদেশে আসে, যার বেশিরভাগই এই নৌরুট ব্যবহার করে। যদিও বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি সরাসরি এ রুটের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়, তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আমদানি-রপ্তানির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় আপাতত বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় মজুত অক্ষুণ্ণ রাখতে জ্বালানি সাশ্রয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা শুরু করলে এর জবাবে আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এতে গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয় তেহরান।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল পরিবহনের বড় একটি অংশ এই প্রণালিপথে সম্পন্ন হয়। প্রতি মাসে কেবল জ্বালানি পরিবহনের জন্যই এই পথে তিন হাজারের বেশি জাহাজ চলাচল করে। বাংলাদেশে ডিজেল ও জেট অয়েলসহ প্রোডাক্ট অয়েলবাহী সাত থেকে আটটি, ক্রুড অয়েলবাহী দুটি, এলপিজিবাহী দুই থেকে তিনটি এবং এলএনজিবাহী তিনটি বিশেষায়িত জাহাজ নিয়মিত আসে।
নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে, তারা নিজেদের অপরিশোধিত তেল এই পথেই আনে। ফলে এই নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট। একটি মাত্র পথ বন্ধ হলে সমুদ্র পরিবহন ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং পুরো সাপ্লাই চেইনে ধস নামে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে বাংলাদেশ বড় পরিসরে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। একই সঙ্গে কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি সংগ্রহ করা হয়। এলপিজির ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্যই প্রধান উৎস।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রতি বছর কাতার থেকে ২ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন টন এবং ওমান থেকে শূন্য দশমিক ৮৫ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করে। এছাড়া সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টনের বেশি অপরিশোধিত তেল আসে। এলপিজির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৪ লাখ টন, যার প্রায় পুরো অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়।
এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের জ্বালানি খাতের পাশাপাশি বাণিজ্য খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিকল্প নৌপথে চলাচলের ক্ষেত্রে জাহাজের যাত্রাপথ বেড়ে যাবে দ্বিগুণেরও বেশি, ফলে কনটেইনার পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হবে। এতে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে জট সৃষ্টি হবে এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
এমএসসি শিপিংয়ের হেড অব অপারেশন আজমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, পরিবহন ধীরগতির হলে ফ্রেট চার্জ বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, হরমুজ প্রণালির কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। বিকল্প পথে জাহাজ চালাতে হলে পরিচালন ব্যয় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে, যার প্রভাব পণ্যমূল্যে গিয়ে দাঁড়াবে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সুয়েজ খালসংলগ্ন রুটও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তখন বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি ও জ্বালানি—তিন খাতেই ভয়াবহ চাপ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, সরকারের এখনই বাড়তি প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত বাড়ানো এবং জনগণকে সাশ্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা জরুরি। বর্তমান মজুত সক্ষমতা মাত্র ২৫ থেকে ২৬ দিনের, যা অন্তত তিন মাসে উন্নীত করা প্রয়োজন। যুদ্ধ এক সপ্তাহের বেশি চললে সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।