২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান ও ব্যাপক সহিংসতার মুখে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের যে ঢল নেমেছিল, তার নয় বছর পূর্ণ হলো। সেই সময় প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার বড় একটি অংশ এখনো কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। দীর্ঘ এই সময়েও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। […]
ছবি: সংগৃহীত
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান ও ব্যাপক সহিংসতার মুখে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের যে ঢল নেমেছিল, তার নয় বছর পূর্ণ হলো। সেই সময় প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার বড় একটি অংশ এখনো কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। দীর্ঘ এই সময়েও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে নিজ দেশে ফেরার স্বপ্ন দিন দিন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ২৪। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত নতুন করে নিবন্ধিত হয়েছেন ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯০ জন। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কমেনি; বরং নতুন করে অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
বছরের পর বছর শিবিরের সীমাবদ্ধ পরিবেশে জীবন কাটাতে কাটাতে রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা এখন নিজেদের ভূমি রাখাইনে নিরাপদে ফিরে যাওয়া। কিন্তু সেই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। ২০২৩ সাল থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছে। বর্তমানে রাজ্যটির বড় একটি অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকায় প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকটও বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে থাকা এই জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক সুযোগের সীমাবদ্ধতা ও কমতে থাকা ত্রাণ সহায়তার চাপের মধ্যে রয়েছে। ইউএনএইচসিআর বলছে, নতুন করে সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে ২০২৪ সালের শুরু থেকে প্রায় দেড় লাখ মানুষ রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে।
ক্যাম্পের অনিশ্চিত জীবন থেকে বেরিয়ে নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় অনেকে বিপজ্জনক সমুদ্রপথ বেছে নিচ্ছেন। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন। ওই বছর ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় বের হন। অর্থাৎ প্রতি সাতজনের প্রায় একজনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শরণার্থী ও অভিবাসীদের বড় সমুদ্রপথগুলোর মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ মৃত্যুহারের ঘটনা।
এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা ২০২৬ সালেও অব্যাহত রয়েছে। জানুয়ারি থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজার ৮০০-এর বেশি রোহিঙ্গা বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বের হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। একই সময়ে মার্চের শেষ দিকে বাংলাদেশ থেকে যাত্রা করা অতিরিক্ত বোঝাই একটি নৌকা দুর্ঘটনার পর আনুমানিক ২৫০ জন নিখোঁজ হন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার প্রথম বড় চুক্তি করে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর। এরপর ১৯ ডিসেম্বর যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি প্রত্যাবাসনের মাঠপর্যায়ের প্রক্রিয়া নিয়ে ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরিত হয়।
ওই চুক্তি অনুযায়ী, মিয়ানমারের প্রতিদিন ৩০০ জন করে সপ্তাহে দেড় হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার কথা ছিল। দুই বছরের মধ্যে প্রত্যাবাসন শেষ করার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
এরপর ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথম দফায় প্রত্যাবাসনের সময় নির্ধারণ করা হলেও রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের কারণে তা কার্যকর হয়নি। ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট থেকে আবার প্রত্যাবাসন শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অধিকার নিয়ে নিশ্চয়তা না থাকায় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরতে রাজি হননি।
২০২২ সালে মিয়ানমারের জান্তা সরকার পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখায়। তবে কবে থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হবে, সে বিষয়ে তখনও কার্যকর কোনো সময়সূচি তৈরি হয়নি।
বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও ২০১৭ সালের বাস্তুচ্যুতির পরিমাণ নিয়েও বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
গত ১৫ আগস্ট এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশের তথ্যকে সঠিক নয় বলে দাবি করে। দেশটির বক্তব্য, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা নিয়ে একতরফা ও ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে।
মিয়ানমারের দাবি অনুযায়ী, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের সহিংসতার আগে উত্তর রাখাইনের বুথিডং, মংডো ও রাথেডং এলাকায় ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করতেন। তাদের হিসাবে, পরবর্তী সময়ে ২ লাখের বেশি মানুষ ওই এলাকায় থেকে যান এবং ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাংলাদেশে চলে আসেন। দেশটি বলছে, এই হিসাবের ভিত্তিতে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের যে সংখ্যা বলা হয়, তা সঠিক নয়।
মিয়ানমার আরও দাবি করেছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের পরিচয় যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। দেশটির ভাষ্য অনুযায়ী, ৪ হাজার ২৪১ জন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমারের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা সঠিক নয় এবং মিয়ানমারের বিবৃতিতে ভুল পরিসংখ্যান ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট এখন বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিস্থিতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে গেছে। ফলে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার দিকে এগোচ্ছে ঢাকা।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আসিয়ান, চীন, তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও নরওয়েসহ বিভিন্ন অংশীদারকে সম্পৃক্ত করে রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য হলো মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, সংকটের উৎপত্তি যেহেতু মিয়ানমারে, সমাধানের উদ্যোগও সেখান থেকেই আসতে হবে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন চায় এবং মিয়ানমার প্রস্তুত হলে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবিরের মতে, প্রত্যাবাসনে কত সময় লাগবে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। এটি মূলত দুই পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সক্রিয় উদ্যোগের ওপর নির্ভর করবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং টেকসই সমাধানও মিয়ানমারকেই নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনই সংকটের চূড়ান্ত সমাধান। একই সঙ্গে সঠিক তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্য যাচাই প্রক্রিয়াকে প্রত্যাবাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আস্থা তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।
ইউএনএইচসিআরও বলছে, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য এখনো অনুকূল নয়। সংস্থাটির ভাষ্য, সংঘাত, নিপীড়ন এবং নাগরিকত্বের নিশ্চয়তার অভাব রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।
নয় বছর পরও তাই কক্সবাজারের ক্যাম্পে বসবাসরত লাখো রোহিঙ্গার সামনে একই প্রশ্ন—কবে তারা নিজেদের ঘরে ফিরতে পারবেন। সময়ের সঙ্গে ক্যাম্পজীবন যেমন দীর্ঘ হচ্ছে, তেমনি নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পথও কঠিন হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, রাখাইনে চলমান সংঘাত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এখনো অধরা।
২৫ আগস্ট আবারও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী স্মরণ করবে তাদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার দিনটি। কিন্তু স্মৃতির পাশাপাশি তাদের প্রত্যাশা একটাই—একদিন যেন নিরাপদে, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের ভূমিতে ফিরে যেতে পারে।