ভারতে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে দ্রুততম সময়ে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী নির্বাচনে ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সী এই তরুণ প্রজন্মই হবে দেশটির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তবয়স্ক ভোটিং ব্লক। নতুন এই পরিবর্তনের ফলে ভারতের প্রথাগত রাজনৈতিক সমীকরণ, নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল এবং দলগুলোর ভোট […]
ছবি: সংগৃহীত
ভারতে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে দ্রুততম সময়ে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী নির্বাচনে ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সী এই তরুণ প্রজন্মই হবে দেশটির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তবয়স্ক ভোটিং ব্লক। নতুন এই পরিবর্তনের ফলে ভারতের প্রথাগত রাজনৈতিক সমীকরণ, নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল এবং দলগুলোর ভোট ব্যাংকের হিসাব বড় ধরনের রূপান্তরের মুখোমুখি হচ্ছে।
সম্প্রতি নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি এবং ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তুমুল আন্দোলন রাজনীতিতে জেন-জির সক্রিয় ভূমিকার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। সাধারণ একটি পাবলিক পরীক্ষা কেন্দ্রিক অসন্তোষ অতি দ্রুত শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত স্বচ্ছতা, সরকারি জবাবদিহিতা এবং যুবসমাজের নিশ্চিত ভবিষ্যতের দাবিতে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনসহ শীর্ষ নেতৃত্বও স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, তরুণদের ক্ষোভ প্রশমনে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে জেন-জির বোঝার উপযোগী ভাষায় যোগাযোগ তৈরি করতে হবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে ভারতে জেন-জির সংখ্যা প্রায় ৩৮ কোটিতে (৩৮০ মিলিয়ন) পৌঁছাবে, যা দেশের মোট অর্জিত জনসংখ্যার প্রায় ২৫.১ শতাংশ। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে আনুমানিক ১৯ কোটি ৯০ লাখ পুরুষ এবং ১৮ কোটি ১০ লাখ নারী থাকবেন। এর মধ্য দিয়ে ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ‘মিলেনিয়াল’ প্রজন্মকে (যাদের জনসংখ্যা সে সময় প্রায় ৩৫ কোটি ৭০ লাখে স্থির থাকবে) টপকে জেন-জি ভারতের সর্ববৃহৎ একক প্রাপ্তবয়স্ক গোষ্ঠীতে উন্নীত হবে। হিসাব অনুযায়ী, ২০২৯ সালের ভোটার তালিকায় প্রতি চারজন যোগ্য ভোটারের মধ্যে একজনই হবেন এই প্রজন্মের সদস্য।
জাতিসংঘের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পূর্বাভাসে দেখা যায়, ভোটার তালিকায় তরুণদের আনুপাতিক হার কিছুটা কমছে। ১৯৮৮ সালে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের হার যেখানে ছিল ৩৮.৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩০.১ শতাংশে এবং ২০২৯ সাল নাগাদ তা ২৭.৮ শতাংশে নামতে পারে। তবে সামগ্রিক শতাংশের অনুপাতে কিছুটা হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও ডিজিটালি সংযুক্ত থাকা, দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাট্টা হওয়ার ক্ষমতা এবং সামাজিক ইস্যুতে সোচ্চার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নীতি নির্ধারণে এদের কৌশলগত প্রভাব আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরদার।
এই জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তনের গুরুত্ব কেবল নির্বাচনের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নেই। এই তরুণ সমাজের মধ্যেই অবস্থান করছে দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষার্থী গোষ্ঠী, নতুন ভোটাধিকার পাওয়া নাগরিক, কর্মজীবনে প্রবেশকারী তরুণ এবং নতুন পরিবার গড়ার কারিগর। ফলে প্রথাগত বিভাজনের রাজনীতির জায়গায় কর্মসংস্থান তৈরি, উন্নত শিক্ষা সংস্কার, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক হুমকি এবং স্বচ্ছ সুশাসনের মতো বিষয়গুলো রাজনৈতিক দলগুলোর মূল ইশতেহারে স্থান পেতে বাধ্য হচ্ছে।
জেন-জির ঠিক পরপরই অবস্থান করছে আরও বড় জনসংখ্যা—’জেনারেশন আলফা’। ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে তারা প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ায় ভোটাধিকার পাবে না, তবে তাদের জনসংখ্যা ৪১ কোটি ৭০ লাখ (৪১৭ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে যাবে, যা একক জেনারেশন হিসেবে ভারতের সর্ববৃহৎ। একই সময়ে ভারতের সার্বিক বয়সের কাঠামো কিছুটা বয়স্ক হওয়ার দিকে ধাবিত হওয়ায় ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সংখ্যা বাড়ছে, যা দেশটির দীর্ঘদিনের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা তরুণ জনমিতিক সুবিধাকে সংকুচিত করছে।
এমন এক বাস্তবতায় জেন-জি এমন সময়ে পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক হচ্ছে যখন একদিকে তারা বৃহত্তম নির্বাচনী শক্তি এবং অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমে সর্বাধিক সোচ্চার কণ্ঠস্বর। সাম্প্রতিক নিট-ইউজি আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৯ সালের সম্ভাব্য ভোটযুদ্ধ—সব মিলিয়ে এই প্রজন্মের সমর্থন লাভ করাই আগামী দিনের ভারতের সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি হতে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি / নিউজ১৮ / রয়টার্স