ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছেন, যেখানে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তই রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সামরিক অভিযান, কূটনৈতিক সমঝোতা কিংবা অর্থনৈতিক চাপ—কোনো পথই এখন সহজ বা নিশ্চিত ফলদায়ী নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, টানা ১৩ রাতের বিমান হামলার পর সাময়িকভাবে তিন রাতের জন্য অভিযান স্থগিত […]
ছবি: সংগৃহীত
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছেন, যেখানে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তই রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সামরিক অভিযান, কূটনৈতিক সমঝোতা কিংবা অর্থনৈতিক চাপ—কোনো পথই এখন সহজ বা নিশ্চিত ফলদায়ী নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, টানা ১৩ রাতের বিমান হামলার পর সাময়িকভাবে তিন রাতের জন্য অভিযান স্থগিত রাখা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য কূটনৈতিক আলোচনার জন্য সময় ও সুযোগ তৈরি করা। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটিও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে আবারও সামরিক চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি তেহরান। এই প্রণালীই বর্তমানে উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
প্রায় পাঁচ মাস আগে শুরু হওয়া এই সংঘাত দ্রুত শেষ হবে বলে ধারণা করা হলেও বাস্তবে তা দীর্ঘায়িত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ বাড়ালেও কাঙ্ক্ষিত ফল এখনো পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে স্থলবাহিনী ব্যবহার করে চাপ আরও বাড়াতে পারে। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হবে, যা যুদ্ধবিরোধী জনমতকে আরও জোরালো করতে পারে।
আরেকটি পথ হলো ইরানের পরিবহন অবকাঠামো ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করা। তবে এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে এবং তাতেও তেহরানের নীতিগত অবস্থান বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে ধারণা করছেন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর কড়াকড়ি আরোপের পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের অবরোধ কার্যকর হতেও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা পুনরায় শুরু করতে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন সংকট তৈরি করবে।
যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাজারে ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়। যদিও রোববার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কিছুটা কমেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের বিকল্প তেল পরিবহন পথেও হামলার হুমকি দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের মজুত কমে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। আর সেই সংকটের মধ্যেই আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনকে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসের এক বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জেনারেল ড্যান কেইন যুদ্ধ বিস্তৃত হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতা নিয়ে তারা সতর্ক করেছেন।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সর্বশেষ মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বিমান হামলা ইরানকে আলোচনার টেবিলে অবস্থান বদলাতে বাধ্য করবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও যুদ্ধবিরতির মতো কোনো সমঝোতায় ফেরার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। তবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণের দাবি পূরণ না হলে এমন চুক্তিতে রাজি হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি সেই দাবি মেনে নেয়, তবে তা রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কংগ্রেস ও জনগণের সঙ্গে একটি জাতীয় সংলাপ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এমন একটি কৌশল দরকার, যাতে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ না পায় এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে।
সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন। ৪০ শতাংশ মনে করেন, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। আর ৭৬ শতাংশের মতে, যুদ্ধটি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে হোয়াইট হাউসের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য, এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসন এখনও অটল।