Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

অন্যান্য
৩:৫১ এএম, ২৬ অক্টোবর ২০২৫

নেদারল্যান্ডসে সরকারি কর্মকর্তা সফর প্রকল্প প্রশিক্ষণে বিতর্ক ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়

কিশোরগঞ্জের ১০ উপজেলার নদীতীর সুরক্ষা ও খাল খনন প্রকল্পের প্রশিক্ষণের জন্য নেদারল্যান্ডসে গেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের ১০ জন কর্মকর্তা। তবে এই সফর নিয়ে সরকারি মহলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, কারণ সাতজন ওই কর্মকর্তাই নন-টেকনিক্যাল এবং প্রকল্পের কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি অর্থে এই ইউরোপ সফর থেকে প্রকল্পে কোনো বাস্তব ফলাফল […]

নেদারল্যান্ডসে সরকারি কর্মকর্তা সফর প্রকল্প প্রশিক্ষণে বিতর্ক ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

কিশোরগঞ্জের ১০ উপজেলার নদীতীর সুরক্ষা ও খাল খনন প্রকল্পের প্রশিক্ষণের জন্য নেদারল্যান্ডসে গেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের ১০ জন কর্মকর্তা। তবে এই সফর নিয়ে সরকারি মহলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, কারণ সাতজন ওই কর্মকর্তাই নন-টেকনিক্যাল এবং প্রকল্পের কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি অর্থে এই ইউরোপ সফর থেকে প্রকল্পে কোনো বাস্তব ফলাফল আসার সম্ভাবনা কম।

বিদেশ সফরের পেছনের প্রেক্ষাপট ও বিতর্ক

২০ অক্টোবর থেকে ১০ দিন ব্যাপী এই প্রশিক্ষণ শুরু হলেও, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অধিশাখা গত ২৪ জুলাই থেকে বিদেশ সফর সীমিত করার নির্দেশনা দেয়ার পরেও, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের তদবিরে এই সফর আয়োজন হয়। প্রাথমিকভাবে অর্থ মন্ত্রণালয় ওই প্রশিক্ষণের অনুমোদন দেয়নি কারণ অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থী নন-টেকনিক্যাল, যা প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

একজন সিনিয়র কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, “সরকারি অর্থ খরচ করে এমন প্রশিক্ষণ যা প্রকল্পের কাজে সুফল বয়ে আনবে না, তা অগ্রহণযোগ্য। সাতজন নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তার নাম থাকায় অনুমোদন আটকে গিয়েছিল, কিন্তু প্রভাবশালী সুপারিশের কারণে সফরটি চালানো হয়েছে।”

মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ভূমিকা

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন বলেন, “এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। নেদারল্যান্ডস দূতাবাস বহু যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা করেছে। আমি নিজেও প্রথমে বিভ্রান্ত হয়েছিলাম, পরে জানতে পেরেছি দূতাবাসই এই আয়োজন করেছে। আমি কাউকে মনোনয়ন দিইনি। এখন প্রশ্ন করতে হবে, দূতাবাস কেন এই ব্যবস্থা নিয়েছে।”

অন্যদিকে, প্রকল্পের পরিচালক এবং পাউবোর ময়মনসিংহ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ শহীদুজ্জামান সরকার জানালেন, “এই প্রশিক্ষণ প্রকল্পের অংশ, যার জন্য বাজেটে ৭০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। নেদারল্যান্ডস সরকার থেকে কোনো অর্থায়ন নেই। প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা পাউবো ও মন্ত্রণালয় মিলে ঠিক করেছে।”

তবে প্ল্যানিং কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হয়তো প্রকৃত বিষয় জানেন না। প্রকল্পের প্রধান কর্মকর্তাই বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন। অনুমোদনের পর সফর হয়। প্রশিক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের সহযোগিতা গ্রহণ করা হয় না হলে ভিসা সমস্যা হতে পারে।”

প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা ও প্রকল্পের বাস্তবতা

এই প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তিন যুগ্ম সচিব, এক উপসচিব, প্ল্যানিং ডিভিশনের দুই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের চার প্রকৌশলী। তবে অধিকাংশ কর্মকর্তা নন-টেকনিক্যাল হওয়ায় প্রশিক্ষণের প্রভাব নিয়ে সংশয় রয়েছে।

কিশোরগঞ্জের নদীতীর সুরক্ষা ও খাল খনন প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ৬৫৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ২০২২ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সুপারিশে একনেকে পাশ হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ১৬ শতাংশ। বরাদ্দের মধ্যে নদীতীর প্রতিরক্ষা কাজে ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ২৬ কোটি টাকা খরচ হয়েছে, অর্থাৎ আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৪ শতাংশ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. এনায়েত উল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “আমাদের চার কর্মকর্তা প্রশিক্ষণে গেছেন, আমি এ ব্যাপারে অবগত আছি।”

প্রকল্পের উন্নয়নে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব ও বিতর্ক

সরকারি প্রশিক্ষণ সফর প্রকল্প উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা না থাকলে তাতে প্রকৃত সুফল পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে, নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের সংখ্যা বেশি হলে প্রশিক্ষণের লক্ষ্য পূরণে বাধা সৃষ্টি হয়। এটি সরকারী অর্থের অপচয় এবং সময়ের অপব্যয় হিসেবেও ধরা যেতে পারে।

নেদারল্যান্ডসের মতো উন্নত দেশের প্রশিক্ষণ থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি আসতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং প্রযুক্তিবিদদের অংশগ্রহণ। অন্যথায় এই ধরনের সফর শুধু ভ্রমণ হিসেবেই থেকে যায়।

এছাড়া, সরকারের বাজেট সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশনার পরও বিদেশ সফরের আয়োজন সরকারী নীতি ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন তোলে। ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ গ্রহণে সরকারি পর্যায়ে কড়াকড়ি এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই বাড়ানো জরুরি।

কিশোরগঞ্জের নদীতীর সুরক্ষা প্রজেক্টের প্রশিক্ষণের জন্য নেদারল্যান্ডস সফর সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও, কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা এবং বাজেট ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন ও অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারি দফতরগুলোকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রশিক্ষণ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান বাস্তব কাজে প্রয়োগ করা না হলে এই ধরনের উদ্যোগ অর্থ-সময় উভয়ের অপচয় হয়ে দাঁড়াবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ