গ্রিস থেকে জার্মানির উদ্দেশে উড্ডয়ন করা একটি রায়ানএয়ারের যাত্রীবাহী বিমানে ঘটে গেল রীতিমতো শিহরণ জাগানো এক ঘটনা। উড্ডয়নের অল্প সময়ের মধ্যেই বিমানের একটি জানালা ভেঙে গেলে ৬১ বছর বয়সী সার্বিয়ান যাত্রী লিউবিশা কারোভিচের শরীরের বড় একটি অংশ কেবিনের বাইরে চলে যায়। মৃত্যুর মুখোমুখি সেই মুহূর্তে স্বামীর দুই পা শক্ত করে ধরে রেখে এবং অন্য যাত্রীদের […]
ছবি: সংগৃহীত
গ্রিস থেকে জার্মানির উদ্দেশে উড্ডয়ন করা একটি রায়ানএয়ারের যাত্রীবাহী বিমানে ঘটে গেল রীতিমতো শিহরণ জাগানো এক ঘটনা। উড্ডয়নের অল্প সময়ের মধ্যেই বিমানের একটি জানালা ভেঙে গেলে ৬১ বছর বয়সী সার্বিয়ান যাত্রী লিউবিশা কারোভিচের শরীরের বড় একটি অংশ কেবিনের বাইরে চলে যায়। মৃত্যুর মুখোমুখি সেই মুহূর্তে স্বামীর দুই পা শক্ত করে ধরে রেখে এবং অন্য যাত্রীদের সহায়তায় তাকে আবার বিমানের ভেতরে টেনে আনেন তার স্ত্রী স্বেতলানা গ্রকোভিচ।
গ্রিসের থেসালোনিকি থেকে জার্মানির মেমিংগেনগামী ফ্লাইটটিতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা-এড়ানোর ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
গ্রিক রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ইআরটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বেতলানা জানান, জানালা ভেঙে যাওয়ার পর প্রায় দুই মিনিট ধরে তার স্বামীর বুক পর্যন্ত অংশ বিমানের বাইরে ঝুলে ছিল। সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তার মাথায় একটাই চিন্তা এসেছিল—”যদি মৃত্যুই আসে, তবে আমরা একসঙ্গেই মরব।”
তিনি বলেন, জানালা ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি স্বামীর পা জড়িয়ে ধরে রাখেন। পাশের আসনে বসা আরেক নারী যাত্রী লিউবিশার হাত ধরে রাখেন। পরে আরও এক যাত্রীর সহায়তায় তিনজন মিলে প্রাণপণ চেষ্টা করে তাকে আবার কেবিনের ভেতরে টেনে আনতে সক্ষম হন।
ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই বিমানের কেবিনের চাপ দ্রুত কমে যায় এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে অক্সিজেন মাস্ক নিচে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো কেবিনজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকজন যাত্রী জানালার ভাঙা অংশ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। একজন একটি স্যুটকেস জানালার সামনে ঠেকিয়ে রাখতে চাইলেও প্রবল বায়ুচাপ সেটিকে মুহূর্তেই বিমানের বাইরে ছুড়ে ফেলে দেয়।
স্বেতলানার ধারণা, বিমানের ডান পাশের ইঞ্জিন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কোনো ধাতব অংশ জানালায় আঘাত করায় সেটি ভেঙে যায়। কয়েকজন যাত্রীও জানান, জানালা ভাঙার আগে তারা বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ শুনেছিলেন।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, লিউবিশা কারোভিচ সিটবেল্ট বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। সেটিই তাকে সম্পূর্ণভাবে বিমানের বাইরে ছিটকে পড়া থেকে রক্ষা করে। তবে তিনি গুরুতর আহত হন এবং কয়েকবার জ্ঞান হারান। তার একটি হাতে মারাত্মক আঘাত এবং দগ্ধ হওয়ার চিহ্ন রয়েছে। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্বেতলানা জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে তার স্বামী এখনো পুরো ঘটনার স্মৃতি মনে করতে পারছেন না। বিমানের প্রসঙ্গ উঠলেই তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। একই সঙ্গে তিনিও গভীর মানসিক ধাক্কার মধ্যে রয়েছেন।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, উড্ডয়নের প্রায় ১০ মিনিট পর বিমানটি জরুরি পরিস্থিতির কারণে দ্রুত প্রায় ৯ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে। পরে পাইলট বিমানটি নিরাপদে থেসালোনিকি বিমানবন্দরে ফিরিয়ে জরুরি অবতরণ করেন।
রায়ানএয়ার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর কেবিনে একটি গুরুতর কারিগরি সমস্যা দেখা দেওয়ায় বিমানটি ফিরে আসে। বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে এবং আহত যাত্রীকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে অন্য একটি বিমানে বাকি যাত্রীদের গন্তব্যে পাঠানো হয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় জড়িত বিমানটি ছিল ১৮ বছর পুরোনো বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের, যা রায়ানএয়ারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাল্টা এয়ার পরিচালনা করছিল।
ঘটনাটি উত্তর মেসিডোনিয়ার আকাশসীমায় ঘটায় তদন্তে যুক্ত হয়েছে একাধিক সংস্থা। গ্রিসের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বোয়িং, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন অ্যাভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (ইএএসএ) যৌথভাবে ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করছে। তদন্তকারীরা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখছেন, ইঞ্জিন থেকে কোনো ধাতব অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে জানালায় আঘাত করেছিল কি না এবং বিমানের কাঠামোগত কোনো ত্রুটি ছিল কি না।