ইসরায়েলি পার্লামেন্টে এমন একটি আইন পাস হয়েছে, যাতে প্রাণঘাতী হামলার দায়ে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক নিন্দার জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ইসরায়েলের শাসনব্যবস্থা যে দীর্ঘদিন ধরে অ্যাপার্থাইড বা বর্ণবৈষম্যমূলক কাঠামো হিসেবে সমালোচিত হয়ে আসছে, এই আইন তা আরও দৃঢ় করবে। […]
ছবি: সংগৃহীত
ইসরায়েলি পার্লামেন্টে এমন একটি আইন পাস হয়েছে, যাতে প্রাণঘাতী হামলার দায়ে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক নিন্দার জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ইসরায়েলের শাসনব্যবস্থা যে দীর্ঘদিন ধরে অ্যাপার্থাইড বা বর্ণবৈষম্যমূলক কাঠামো হিসেবে সমালোচিত হয়ে আসছে, এই আইন তা আরও দৃঢ় করবে।
আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, আইনটি ইসরায়েলের ইহুদি নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। ফলে এটি মূলত দখলকৃত অঞ্চলের ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করেই তৈরি করা হয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন। এ কারণেই দেশটির কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এ আইন নিয়ে উল্লাস দেখা গেছে।
ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং যুক্তরাজ্য এ বিলের প্রকাশ্য বর্ণবাদী চরিত্র নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। রোববার এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বিলটির বৈষম্যমূলক প্রকৃতি তাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। তাদের মতে, এটি আইনে পরিণত হলে ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচও এ আইনকে ইসরায়েলি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার একটি হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেছে।
নতুন আইনের মূল লক্ষ্য সামরিক আদালত, যেখানে দখলকৃত এলাকার ফিলিস্তিনিদের বিচার করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে কোনো ইসরায়েলি নাগরিককে হত্যার অভিযোগে ফিলিস্তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। অন্যদিকে ইসরায়েলি নাগরিকদের জন্য একই ধরনের মামলায় বেসামরিক আদালত মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
বৈষম্যের আরও ভয়াবহ চিত্রও উঠে এসেছে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে। ২০১০ সালে ইসরায়েলি আদালত ব্যবস্থা নিজেই স্বীকার করেছিল, পশ্চিম তীরে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের ৯৯ দশমিক ৭৪ শতাংশকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। অন্যদিকে ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়া প্রায়ই আলাদা পথে এগোয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক সপ্তাহে ইহুদি বসতিস্থাপনকারীরা সাতজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। তবে তাদের বিচার হয়েছে ইসরায়েলের বেসামরিক আদালতে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দশকের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ইসরায়েলি নাগরিককে ফিলিস্তিনি হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি।
ইয়েশ দিন নামে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠনের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধ করা ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশ তদন্ত অভিযোগ গঠন ছাড়াই বন্ধ হয়ে গেছে।
আইনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো আমিচাই কোহেন বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীরের জন্য ইসরায়েলি পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন করতে পারে না, কারণ ওই অঞ্চল ইসরায়েলের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ নয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এক বছরের মধ্যে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম থেকে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব শেষ করার আহ্বান জানিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও ওই দখলদারত্বকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তার আইনি কাঠামোকে ফিলিস্তিনিদের দমনে ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ইসরায়েলি কারাগারে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেককে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই প্রশাসনিকভাবে আটক বা অবৈধ যোদ্ধা হিসেবে রাখা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি শিশুদের মা-বাবার উপস্থিতি ছাড়াই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং প্রায়ই তাদের আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের জন্য ঘরবাড়ি তৈরির অনুমতি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর অনুমতিহীন বাড়িঘর নিয়মিত ভেঙে ফেলা হয়। বিপরীতে ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের অবৈধ স্থাপনাগুলো প্রায়ই বৈধতা পেয়ে যায়।
বিলের পক্ষে সমর্থনের পর ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরকে শ্যাম্পেন পান করে উদযাপন করতে দেখা গেছে। সমালোচকদের মতে, এই আইন ফিলিস্তিনিদের আরও দ্রুত এবং কম যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে হত্যা করার একটি রাজনৈতিক অস্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়।