বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছগুলো দীর্ঘস্থায়ী খরার মধ্যেও কীভাবে বেঁচে থাকে, সেই রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এতদিনের প্রচলিত ধারণার বিপরীতে বিশাল আকারের এসব গাছ বিশেষ জৈবিক অভিযোজনের মাধ্যমে পানির সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম। গবেষণাটি গত ২ জুলাই বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স (Science)-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পাওলো […]
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছগুলো দীর্ঘস্থায়ী খরার মধ্যেও কীভাবে বেঁচে থাকে, সেই রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এতদিনের প্রচলিত ধারণার বিপরীতে বিশাল আকারের এসব গাছ বিশেষ জৈবিক অভিযোজনের মাধ্যমে পানির সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম।
গবেষণাটি গত ২ জুলাই বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স (Science)-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পাওলো বিটেনকোর্ট।
বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছগুলোর মধ্যে ডিপটেরোকার্প (Dipterocarp) অন্যতম। ডানার মতো বীজের কারণে এ গাছের এমন নামকরণ হয়েছে। কিছু ডিপটেরোকার্প গাছের উচ্চতা ১০০ মিটারেরও বেশি।
উচ্চতার কারণে এসব গাছ অন্যদের তুলনায় বেশি সূর্যালোক পেলেও শিকড় থেকে পাতায় পানি পৌঁছে দেওয়া তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, খরার সময় বড় গাছ ছোট গাছের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
গাছের কাণ্ডে থাকা জাইলেম (Xylem) নামের সূক্ষ্ম নালির মাধ্যমে শিকড় থেকে পানি পাতায় পৌঁছায়। মানুষের মতো গাছের কোনো হৃদ্যন্ত্র নেই; পাতার মাধ্যমে পানি বাষ্পীভূত হওয়ার ফলে তৈরি হওয়া টানের সাহায্যেই পানি ওপরে উঠে যায়। তবে গাছ যত উঁচু হয়, মাধ্যাকর্ষণ এবং দীর্ঘ পথের কারণে এই প্রক্রিয়া তত কঠিন হয়ে পড়ে।
এই ধারণা যাচাই করতে গবেষকরা ২০২২ সালে উত্তর-পূর্ব বোর্নিওর একটি রেইনফরেস্টে তিন মাস ধরে ৩৮টি ডিপটেরোকার্প গাছ পর্যবেক্ষণ করেন। এর মধ্যে ২৭টি গাছের বৃদ্ধি ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট ৭৭০ দিন ধরে বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ডিপটেরোকার্প গাছ নিজেদের অভ্যন্তরীণ গঠন এমনভাবে অভিযোজিত করেছে, যাতে বিশাল উচ্চতাতেও পাতায় পর্যাপ্ত পানি পৌঁছানো সম্ভব হয়।
গবেষকদের মতে, গাছের জাইলেম নিচের দিকে যেতে যেতে আরও প্রশস্ত হয়ে যায়, ফলে পানির প্রবাহে বাধা কমে। পাশাপাশি সবচেয়ে উঁচু পাতাগুলোতে অস্মোলাইট (Osmolytes) নামে বিশেষ রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ বেশি থাকে। এই উপাদান পানির স্বল্পতার সময় কোষের গঠন স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। ফলে ওপরের পাতাগুলোও খরার সময় তুলনামূলকভাবে আর্দ্র থাকে।
গবেষণার প্রধান পাওলো বিটেনকোর্ট বলেন, গাছগুলো নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য এমনভাবে মানিয়ে নিয়েছে, যা তাদের চরম উচ্চতায় থেকেও পাতায় পানি ধরে রাখতে সহায়তা করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ছয় মাসের খরার সময় গাছের উচ্চতার সঙ্গে বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার কোনো সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বের বনাঞ্চলে সবচেয়ে উঁচু মাত্র ১ শতাংশ গাছেই মোট সঞ্চিত কার্বনের অর্ধেকের বেশি সংরক্ষিত থাকে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন মডেলে এতদিন ধরে ধরে নেওয়া হয়েছিল, খরার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে এই বিশাল গাছগুলোর।
তবে নতুন গবেষণার ফলাফল সেই ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গবেষকদের মতে, ডিপটেরোকার্প গাছের এই বিশেষ পানি পরিবহন ব্যবস্থা ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন, বন সংরক্ষণ এবং কার্বন সঞ্চয়নসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: সায়েন্স, দ্য ইকোনমিস্ট