দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতিতে বিয়ের আগে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে শুধুমাত্র সেই কারণেই “চরিত্রহীনতা” বা নৈতিক অবক্ষয়ের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না বলে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার (৮ জুন) তেলেঙ্গানার এক পুলিশ কনস্টেবল প্রার্থীর নিয়োগ বাতিল সংক্রান্ত মামলার রায়ে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত এই মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে আদালত সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নিয়োগ বাতিলের […]
ছবি: সংগৃহীত
দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতিতে বিয়ের আগে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে শুধুমাত্র সেই কারণেই “চরিত্রহীনতা” বা নৈতিক অবক্ষয়ের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না বলে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।
সোমবার (৮ জুন) তেলেঙ্গানার এক পুলিশ কনস্টেবল প্রার্থীর নিয়োগ বাতিল সংক্রান্ত মামলার রায়ে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত এই মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে আদালত সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তও খারিজ করে দিয়েছেন।
বিচারপতি মনমানোহন এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্র সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ মামলার শুনানি শেষে বলেন, আধুনিক সমাজে প্রাপ্তবয়স্কদের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে কেবল বিয়েতে পরিণত হয়নি বলে প্রতারণা বা নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে দেখা যায় না।
মামলার নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, তিনি বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে ২০১৫ সালে লোক আদালতের মাধ্যমে মামলাটি আপসের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হয়। প্রার্থী চাকরির আবেদনপত্রে মামলার বিষয়টিও গোপন করেননি।
এরপরও তেলেঙ্গানা স্টেট লেভেল পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড ওই মামলার বিষয়টি উল্লেখ করে তাকে “নৈতিক অবক্ষয়”-এর অভিযোগে নিয়োগের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে। বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি।
রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেন, ভারতের আইনে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিপূর্ণ সম্পর্কের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কোনো সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত বিয়েতে রূপ নেয়নি বলেই সেটিকে প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। আদালত আরও উল্লেখ করেন, সব সম্পর্ক বিয়েতে পরিণত হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয় এবং বর্তমান সমাজে সম্পর্কের ধরন ও সামাজিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়েছে।
আদালত বলেন, লোক আদালতে আপসের মাধ্যমে কোনো মামলার নিষ্পত্তি হওয়া মানেই অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ স্বীকার করেছেন—এমনটি ধরে নেওয়া যায় না। তাই শুধুমাত্র আপসের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হওয়া একটি মামলার কারণে কোনো ব্যক্তিকে নৈতিকভাবে অযোগ্য বা চরিত্রগতভাবে অনুপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।
সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেন, এ ধরনের মামলায় প্রতারণা প্রমাণের বিষয়টি মূলত অভিযোগকারীর সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। যেহেতু সংশ্লিষ্ট মামলায় অভিযোগকারী নারী পরবর্তীতে আর অভিযোগ চালিয়ে যাননি এবং আপসের মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তিতে সম্মতি দিয়েছেন, তাই প্রার্থীর বিরুদ্ধে চরিত্রগত অযোগ্যতার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি ছিল না।
রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, কোনো ফৌজদারি মামলা পরবর্তীতে নিষ্পত্তি হয়ে গেলে অথবা অভিযোগ প্রমাণিত না হলে শুধুমাত্র সেই মামলার অস্তিত্বের কারণে একজন ব্যক্তির চরিত্র, সততা বা পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। স্পষ্ট অপরাধ, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এবং অভিযুক্তের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলেই কেবল নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিকূল সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এর আগে তেলেঙ্গানা স্টেট লেভেল পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড “নৈতিক অবক্ষয়”-এর অভিযোগ তুলে প্রার্থীর নিয়োগ বাতিল করে। বিষয়টি বিভিন্ন পর্যায়ে বিচারিক পর্যালোচনার পর শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছায়।
চূড়ান্ত রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেন, মামলার বাস্তবতা, উপস্থাপিত প্রমাণ এবং আইনগত অবস্থান বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত টেকসই নয়। ফলে তার বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলো।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, নৈতিকতা এবং সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই রায় ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।