ভারত ও নেপালের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের অন্যতম ঐতিহাসিক ভিত্তি ১৮১৬ সালের ‘সুগৌলি চুক্তি’। তবে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তির মূল কপি নেপাল সরকারের কাছে আদৌ রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। নেপালের পার্লামেন্টে সরকারই জানিয়েছে, জাতীয় আর্কাইভসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান চালিয়েও চুক্তিটির মূল নথি পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে লিম্পিয়াধুরা, […]
ছবি: সংগৃহীত
ভারত ও নেপালের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের অন্যতম ঐতিহাসিক ভিত্তি ১৮১৬ সালের ‘সুগৌলি চুক্তি’। তবে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তির মূল কপি নেপাল সরকারের কাছে আদৌ রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। নেপালের পার্লামেন্টে সরকারই জানিয়েছে, জাতীয় আর্কাইভসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান চালিয়েও চুক্তিটির মূল নথি পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখ নিয়ে ভারত-নেপাল সীমান্ত উত্তেজনা আবারও বেড়েছে। এই তিনটি অঞ্চল নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে নেপাল। তাদের দাবির অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ভিত্তি সুগৌলি চুক্তি। কিন্তু চুক্তিটির মূল নথি খুঁজে পেতে পার্লামেন্টের উদ্যোগে গঠিত একটি অনুসন্ধানী দল জাতীয় আর্কাইভ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও জাদুঘরে তল্লাশি চালিয়েও কোনো আসল কপি উদ্ধার করতে পারেনি।
নেপালের প্রতিনিধি সভার এক বৈঠকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খিনাল জানান, সুগৌলি চুক্তির মূল কপি সরকারের হেফাজতে রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাদের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। কাঠমান্ডু পোস্টের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় আর্কাইভে কিছু চুক্তির নথি রয়েছে, কিন্তু সেগুলোই মূল চুক্তি কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি এবং ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির অনুলিপি সরকারের কাছে রয়েছে। তবে ১৮১৬ সালের চুক্তির মূল কপি পাওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমান ভারত-নেপাল সীমান্ত বিরোধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু সুগৌলি চুক্তির ৫ নম্বর ধারা। চুক্তি অনুযায়ী, নেপাল কালী বা মহাকালী নদীর পশ্চিমের ভূখণ্ডের ওপর থেকে দাবি প্রত্যাহার করে। এর মাধ্যমে নদীটিকে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
তবে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কালী নদীর প্রকৃত উৎস কোথায়?
নেপালের দাবি, কালী নদীর উৎপত্তি লিম্পিয়াধুরায়। সে হিসাবে লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখ নদীর পূর্বদিকে অবস্থিত হওয়ায় এসব অঞ্চল নেপালের ভূখণ্ডের অংশ।
অন্যদিকে ভারতের অবস্থান হলো, কালী নদীর উৎস লিপুলেখ অঞ্চলের নিচের একটি ঝরনা থেকে। দেশটি প্রশাসনিক ও রাজস্ব নথির ভিত্তিতে দাবি করে আসছে, কালাপানি ঐতিহাসিকভাবে অবিভক্ত উত্তর প্রদেশের এবং বর্তমানে উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড় জেলার অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে।
তবে কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুগৌলি চুক্তির মূল নথিতে কালী নদীর উৎস হিসেবে লিম্পিয়াধুরার নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। একই সঙ্গে চুক্তির সঙ্গে কোনো সীমান্ত মানচিত্র সংযুক্ত ছিল কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
ভারত ও নেপালের এই সীমান্ত বিরোধ ২০২০ সালে নতুন মাত্রা পায়। ওই বছর ভারত উত্তরাখণ্ডের সঙ্গে লিপুলেখকে যুক্ত করে কৈলাশ মানসরোবর যাত্রার জন্য প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক উদ্বোধন করে। নেপাল এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার বিষয়টিকে বড় জাতীয়তাবাদী ইস্যুতে পরিণত করে। পরে লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানিকে নেপালের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করা হয়। পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সেই মানচিত্র অনুমোদন করা হয় এবং জাতীয় প্রতীকেও তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সম্প্রতি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ পার্লামেন্টে মন্তব্য করেন, ভারত যেমন নেপালের ভূখণ্ড দখল করেছে, তেমনি নেপালও বিভিন্ন স্থানে ভারতের জমি দখল করে রেখেছে। পরে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা দিয়ে জানায়, ওই বক্তব্য প্রযুক্তিগত সীমান্ত দখলের প্রসঙ্গে করা হয়েছিল এবং বিতর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে নেপালের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এদিকে ভারত ও চীন লিপুলেখ গিরিপথ দিয়ে আবারও বাণিজ্য চালুর বিষয়ে সম্মত হলে নেপাল নতুন করে আপত্তি জানায়।
এ অবস্থায় সীমান্ত দাবির অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ভিত্তি সুগৌলি চুক্তির মূল নথিই যখন নেপালের হাতে নেই বলে সরকার স্বীকার করছে, তখন ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনায় কাঠমান্ডুর ঐতিহাসিক ও আইনি দাবির অবস্থান কতটা শক্তিশালী থাকবে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে