মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত আসিয়ান আঞ্চলিক সম্মেলনে চীন এক সুস্পষ্ট সংকেত দিয়েছে—মুক্ত ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্যের পক্ষে তারা অটল। বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপ ও সুরক্ষাবাদী নীতির বিরুদ্ধে চীনের এই অবস্থানকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ছয় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং সকল অংশগ্রহণকারী দেশকে বলেছিলেন, পূর্ব এশিয়ার শান্তি […]
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত আসিয়ান আঞ্চলিক সম্মেলনে চীন এক সুস্পষ্ট সংকেত দিয়েছে—মুক্ত ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্যের পক্ষে তারা অটল। বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপ ও সুরক্ষাবাদী নীতির বিরুদ্ধে চীনের এই অবস্থানকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ছয় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং সকল অংশগ্রহণকারী দেশকে বলেছিলেন, পূর্ব এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হলে মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখা প্রয়োজন। তিনি প্রোটেকশনিজম বা সুরক্ষাবাদের প্রবণতাকে প্রত্যাখ্যান করার গুরুত্বেও জোর দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লি চিয়াংয়ের এই বক্তব্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের অস্ত্রবিরতি সম্প্রসারণ তদারকি করার পাশাপাশি চারটি দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষর করেন। যদিও এই চুক্তিগুলো তাত্ক্ষণিক আমদানি শুল্ক কমায়নি, তবে ভবিষ্যতে শুল্ক কমানোর সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য উত্তেজনা প্রশমনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।’ তবে ট্রাম্প জাপানে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এখনই কার্নির সঙ্গে দেখা করতে চাই না।’
দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের বাণিজ্য উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় দেশ হিসেবে ব্রাজিলের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’
চীনের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি (আরসিইপি) সদস্য দেশগুলো—আসিয়ান, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া—২০২০ সালের পর প্রথমবারের মতো সম্মেলনে মিলিত হয়ে দ্রুত বাণিজ্য সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছে। আরসিইপি বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৩০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগও রয়েছে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্টা জানিয়েছেন, তারা মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করতে চায়, কিন্তু চীনের রেয়ার আর্থ মেটাল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বিগ্ন। চীন বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি রেয়ার আর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে, যা বৈদ্যুতিক যান, সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য অপরিহার্য।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তোশিহিরো কিতামুরাও বলেছেন, ‘চীনের রপ্তানি সীমাবদ্ধতা বিশ্ব সরবরাহ চেইনে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির সামনে চীন যেন মুক্ত বাণিজ্যের রক্ষক হওয়ার চেষ্টা করছে।’
এই সম্মেলনে চীনের পেশ করা বার্তাটি স্পষ্ট—বেইজিং নিজেদেরকে মুক্ত বাণিজ্যের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সুরক্ষাবাদী নীতির বিরুদ্ধে। তবে ইউরোপ ও জাপানের উদ্বেগের কারণে বোঝা যায়, চীনের বাণিজ্যনীতি ও কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন সরাসরি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে। মুক্ত বাণিজ্যের পক্ষে চীনের এই দৃঢ় অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ পুনরায় সুগম করতে পারে। তবে, বিভিন্ন দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনা ও কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব বাজারে মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ ব্যাঘাত এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই, পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে তারা এই পরিবর্তনগুলোর প্রেক্ষাপট বুঝে ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সাজিয়ে নিক।