বছরের পর বছর ধরে সম্ভাব্য হামলা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রক্ষায় ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার নির্মাণ করে এসেছে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর এই দীর্ঘদিনের কৌশল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের বিভিন্ন ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে […]
ছবি: সংগৃহীত
বছরের পর বছর ধরে সম্ভাব্য হামলা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রক্ষায় ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার নির্মাণ করে এসেছে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর এই দীর্ঘদিনের কৌশল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের বিভিন্ন ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। যুদ্ধবিমান ও ড্রোন এসব ঘাঁটির ওপর টহল দিচ্ছে এবং ক্ষেপণাস্ত্রবাহী লঞ্চারগুলো বাঙ্কার থেকে বের হলেই সেগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ইরানের কথিত ‘মিসাইল সিটি’ বা ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির প্রবেশপথের কাছে ইসরাইলি ও মার্কিন বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চারের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে। এসব ঘাঁটির মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের শিরাজ শহরের আশপাশের কয়েকটি স্থাপনা একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইসফাহান, তাবরিজ ও কেরমানশাহের কাছেও একই ধরনের ঘাঁটিতে হামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, সংঘাতের এই সময়ে এসব ঘাঁটিতে ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে, যার বেশিরভাগই ভূগর্ভস্থ স্থাপনার দিকে লক্ষ্য করে চালানো হয়।
ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’
২০২৫ সালের মার্চে ইরান একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিল, যেখানে দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ করিডরে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ট্রাক চলাচল করতে দেখা যায়। তবে সেই ঘাঁটির অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি।
কিছু ঘাঁটিতে আবার মাটির নিচে বিশেষ সাইলো তৈরি করা হয়েছে, যেখান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র বাইরে না এনে সরাসরি নিক্ষেপ করা যায়। দক্ষিণ ইরানের খোরমুজ এলাকার কাছে এমন একটি ঘাঁটিতে প্রায় নয়টি সাইলো থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
এসব সাইলো সাধারণত পাহাড়ের গায়ে খনন করা গভীর গর্তের মতো, যার সঙ্গে ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় প্রবেশের জন্য একটি শক্তপোক্ত পথ তৈরি করা থাকে।
তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সিএনএ কর্পোরেশনের গবেষণা বিশ্লেষক ডেকার এভেলেথ মনে করেন, ইরান ধীরে ধীরে এই ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ কৌশল থেকে সরে আসছে। তার মতে, এসব সাইলো পুনরায় ব্যবহার করা প্রযুক্তিগতভাবে জটিল হওয়ায় এ ধরনের কৌশল কার্যকর রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরান কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ট্রাক লঞ্চার বাঙ্কার থেকে সরিয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রেখেছিল, যাতে সেগুলো সহজে শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তু না হয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এখন নির্দিষ্ট ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার কৌশল গ্রহণ করেছে। এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ইরানের বহু ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি রয়েছে, যেগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমার সংখ্যাও সীমিত, যা মাটির গভীরে থাকা এসব স্থাপনা ধ্বংস করতে পারে।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কিছুটা কমেছে
ইসরাইলি ও মার্কিন কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে তেহরান থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তাদের দাবি, ইরানি লঞ্চার কেন্দ্রগুলোর ওপর অব্যাহত হামলার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই হ্রাসের আরেকটি কারণ হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র মজুত সংরক্ষণ করছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার
ইরানের কাছে মোট কত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতভেদ আছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের হাতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা ৬ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন যে, ইরান তার পুরোনো ‘মিসাইল সিটি’ কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য তেহরান তার অস্ত্রভাণ্ডার কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।