১৮ মাস ধরে পরিবারের ধারণা ছিল, তাদের বড় ছেলে আর বেঁচে নেই। গাজার হাসপাতাল, মর্গ ও ধ্বংসস্তূপের নিচে খোঁজ করেও কোনো সন্ধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুসনদ পর্যন্ত সংগ্রহ করেছিল পরিবারটি। বাড়ির সামনে টানানো হয়েছিল শোকের তাঁবু। কিন্তু সোমবার (৪ মে) এক ফোনকল পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়। এক আইনজীবীর মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, ২৫ বছর […]
ছবি: সংগৃহীত
১৮ মাস ধরে পরিবারের ধারণা ছিল, তাদের বড় ছেলে আর বেঁচে নেই। গাজার হাসপাতাল, মর্গ ও ধ্বংসস্তূপের নিচে খোঁজ করেও কোনো সন্ধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুসনদ পর্যন্ত সংগ্রহ করেছিল পরিবারটি। বাড়ির সামনে টানানো হয়েছিল শোকের তাঁবু।
কিন্তু সোমবার (৪ মে) এক ফোনকল পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়। এক আইনজীবীর মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, ২৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি তরুণ ঈদ নায়েল আবু শার জীবিত আছেন এবং বর্তমানে ইসরায়েলের ওফার কারাগারে আটক রয়েছেন।
গাজার বহু পরিবারের মতো আবু শার পরিবারও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় ছিল। ঈদ নিখোঁজ হওয়ার পর তারা বুঝতে পারছিল না, তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন, কোনো অজ্ঞাত কবরে দাফন হয়েছেন নাকি আটক আছেন।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর গাজার মধ্যাঞ্চলের নেতজারিম করিডরের কাছে নিখোঁজ হন ঈদ। যুদ্ধ চলাকালে এলাকাটি “অ্যাক্সিস অব ডেথ” বা মৃত্যুফাঁদ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে, যেখানে বহু ফিলিস্তিনি নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন।
ঈদের বাবা নায়েল আবু শার বলেন, ছেলেকে খুঁজতে গিয়ে তারা হাসপাতাল ও মর্গে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন। কোথাও অজ্ঞাত মরদেহের খবর পেলেই সেখানে ছুটে গেছেন। রেডক্রসসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছেও সাহায্য চেয়েছিলেন, কিন্তু কোথাও ঈদের আটকের তথ্য পাননি।
শেষ পর্যন্ত পরিবার ধরে নেয়, ঈদ আর বেঁচে নেই। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও তাকে মৃত হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
তবে ঈদের মা মাহা আবু শার কখনো আশা হারাননি। তিনি গায়েবানা জানাজায়ও রাজি হননি। তার বিশ্বাস ছিল, ছেলে এখনো জীবিত।
প্রায় এক মাস আগে ওফার কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া এক ব্যক্তি জানান, সেখানে তিনি ঈদ আবু শার নামের একজন বন্দীকে দেখেছেন। পরে এক আইনজীবী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর শোকের পরিবেশ বদলে যায় আনন্দে। প্রতিবেশীদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। দীর্ঘদিনের কান্নার বাড়িতে ফিরে আসে আশার আলো।
তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, গাজায় এখনো হাজারো পরিবার একই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ফিলিস্তিনি নিখোঁজ ও গুমবিষয়ক কেন্দ্রের পরিচালক নাদা নাবিলের দাবি, বর্তমানে সাত থেকে আট হাজার ফিলিস্তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত দেড় হাজার মানুষকে ইসরায়েলের কারাগারে গোপনে আটক রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তার অভিযোগ, আটক ব্যক্তিদের তথ্য গোপন রাখার কারণে পরিবারগুলোর মানসিক যন্ত্রণা আরও বাড়ছে। তিনি এটিকে মানসিক নির্যাতন ও সমষ্টিগত শাস্তির অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।
মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায়, এমন পরিস্থিতিকে বলা হয় “অনিশ্চিত শোক”। স্বজন বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, তা নিশ্চিতভাবে জানতে না পারায় পরিবারগুলো দীর্ঘ সময় মানসিক চাপের মধ্যে থাকে।
ঈদের মা মাহা আবু শার বলেন, ছেলে জীবিত থাকার খবর তাকে আনন্দ দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন দুশ্চিন্তাও তৈরি করেছে। তার আশঙ্কা, কারাগারে ঈদ কী ধরনের কষ্ট সহ্য করছেন সেটাই এখন সবচেয়ে বড় ভয়। তিনি বলেন, ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে না পারা পর্যন্ত তার শান্তি মিলবে না।
সূত্র: আল–জাজিরা