চলতি বছরের ‘এল নিনো’ জলবায়ুগত পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, এই শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে যে […]
ছবি: সংগৃহীত
চলতি বছরের ‘এল নিনো’ জলবায়ুগত পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, এই শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে যে আবহাওয়াগত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেটিই ‘এল নিনো’ নামে পরিচিত। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহ, বায়ুমণ্ডলীয় চাপ এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা বদলে দেয়। সাধারণত প্রতি ২ থেকে ৭ বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয় এবং এর প্রভাব প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এর ফলে বিশ্বের এক অঞ্চলে তীব্র খরা দেখা দিলেও অন্য অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়।
আন্তঃসরকারি সংস্থা ‘ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস’-এর (ইসিএমডব্লিউএফ) এল নিনো বিশেষজ্ঞ টিম স্টকডেল বলেছেন, গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এল নিনো পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতায় এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস মডেল একই ধরনের ফলাফল দিচ্ছে এবং সবগুলোই একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
একটি মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “আমরা আগে কখনো এত শক্তিশালী এবং এত সামঞ্জস্যপূর্ণ পূর্বাভাস দেখিনি। যদি এবারের এল নিনো শেষ পর্যন্ত রেকর্ড না ভাঙে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় বিস্ময়।”
যদিও এল নিনো সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছায়, তবে এর বৈশ্বিক প্রভাব আরও কিছু সময় ধরে অনুভূত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায়। এর আগেও একই ধরনের পরিস্থিতির কারণে ২০২৩ সাল ছিল রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর এবং ২০২৪ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছিল।
মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা ইতোমধ্যে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে, এটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এর তীব্রতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের খাদ্য ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির জন্য জরুরি তহবিলের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখা দিতে পারে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাধারণত স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে। এ কারণে ভারতসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য খাদ্য উৎপাদন সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি শুরু করেছে।
অস্ট্রেলিয়ায় এল নিনোর সময় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
আফ্রিকার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপাত হলেও দক্ষিণ, পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় খরা ও পানির সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল, বিশেষ করে পেরু ও ইকুয়েডরে অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে উত্তর ব্রাজিলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় শুষ্ক আবহাওয়া তৈরি হবে, যা আমাজন বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনাগুলোর প্রভাব আগের তুলনায় আরও তীব্র হয়ে উঠছে। তাই সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।