দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত ও দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার। প্রতিদিন এখানে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, গরু-ছাগলসহ নানা ধরনের দান আসে। তবে এসব দানের অর্থ থেকে বছরে কত আয় হয় এবং সেই অর্থ কোথায় ব্যয় করা হয়—তার কোনো সুস্পষ্ট হিসাব নেই বলে জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম। শুক্রবার (১২ জুন) […]
ছবি: সংগৃহীত
দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত ও দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার। প্রতিদিন এখানে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, গরু-ছাগলসহ নানা ধরনের দান আসে। তবে এসব দানের অর্থ থেকে বছরে কত আয় হয় এবং সেই অর্থ কোথায় ব্যয় করা হয়—তার কোনো সুস্পষ্ট হিসাব নেই বলে জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম।
শুক্রবার (১২ জুন) সকালে মাজার পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু ব্যক্তি মাজারের আয় সংগ্রহ করে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে ব্যয় করে আসছেন। অথচ এটি একটি জনসাধারণের সম্পদ এবং এর অর্থ ইচ্ছামতো ব্যবহার করার সুযোগ নেই।
ডিসি বলেন, “এখন থেকে মাজারের সব আয়-ব্যয়ের লিখিত হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে। আমরা কঠোরভাবে নির্দেশনা দিয়েছি, যাতে প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড থাকে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।”
তিনি জানান, বর্তমানে সরকারি অর্থায়নে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে মাজার এলাকায় একটি নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে সরকার ২৫ কোটি টাকা দিচ্ছে এবং বাকি ৫ কোটি টাকা মাজার কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা। কিন্তু মাজার কর্তৃপক্ষ সেই অর্থ দিতে পারছে না।
ডিসি সারওয়ার আলম বলেন, “পাঁচ কোটি টাকার মধ্যে তিন কোটি টাকা সিলেট সিটি করপোরেশন দিয়েছে। বাকি দুই কোটি টাকা মাজার কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা থাকলেও তারা তা দিতে পারেনি। এ অবস্থায় পরিকল্পনা কমিশন মাজারের আয়ের উৎস ও ব্যয়ের হিসাব জানতে চেয়েছে। তখনই দেখা যায়, তাদের কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য আয়-ব্যয়ের রেকর্ড নেই।”
অন্যদিকে শাহজালাল মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান স্বীকার করেছেন যে মাজারের দানের অর্থ দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত পদ্ধতিতেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তিনি বলেন, “আয়ের কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। কারণ প্রতি মাসে সমান আয় হয় না। যে টাকা আসে, তা দিয়ে বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, কর্মচারীদের বেতন এবং অন্যান্য খরচ চালানো হয়। আমরা যে একেবারেই ব্যবহার করি না, তা নয়। এভাবেই বহু বছর ধরে ব্যবস্থা চলে আসছে।”
মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাবের বিষয়টি নিয়ে সিলেটের ধর্মীয় ও সামাজিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
সিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবিব আহমদ শিহাব বলেন, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার সিলেটবাসীর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এতদিন ধরে দান-খয়রাতের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল।
তিনি বলেন, “মানুষ লাখ লাখ টাকা দান করেন, গরু-ছাগল মানত করেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে এসব দানের প্রকৃত হকদার গরিব, এতিম ও অসহায় মানুষ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অন্যরা সেই সুবিধা ভোগ করছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়।”
জেলা প্রশাসকের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, সিলেটের অধিকাংশ মানুষ মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার পক্ষে রয়েছেন।
একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন দরগাহ মসজিদের মুফতি হাসানও। তিনি মনে করেন, দানের অর্থের সঠিক হিসাব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
এদিকে ডিসি সারওয়ার আলম জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসাকে একত্র করে একটি আধুনিক “ইসলামিক কমপ্লেক্স” গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা চাই এখানে এমন একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে শিক্ষার্থীরা দ্বীনি জ্ঞান ও নৈতিকতার দিক থেকে দেশের সেরা অবস্থানে যেতে পারে।”
মাজারের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে ইতোমধ্যে সিলেটের বিভিন্ন মহল ইতিবাচকভাবে দেখছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছতা দূর করে মাজার পরিচালনায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।