ইউক্রেন যুদ্ধ থামার কোনো ইঙ্গিত নেই, তার মধ্যেই আরও কঠোর অবস্থানের বার্তা দিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একদিকে ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ আরও তীব্র করার অঙ্গীকার, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরানের পাশে থাকার ঘোষণা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবারও উত্তেজনার ইঙ্গিত দিল মস্কো। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর এসব বিষয়ে কথা […]
ছবি: সংগৃহীত
ইউক্রেন যুদ্ধ থামার কোনো ইঙ্গিত নেই, তার মধ্যেই আরও কঠোর অবস্থানের বার্তা দিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একদিকে ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ আরও তীব্র করার অঙ্গীকার, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরানের পাশে থাকার ঘোষণা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবারও উত্তেজনার ইঙ্গিত দিল মস্কো।
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর এসব বিষয়ে কথা বলেন পুতিন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তি আলোচনায় কাজ করতেও নিজের আগ্রহের কথা জানান তিনি।
মঙ্গলবার এসসিও বৈঠকের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন পুতিন। সেখানে ইরানের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দেশটির জনগণের ‘সাহস ও দৃঢ়তার’ প্রতি রাশিয়ার সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি।
পুতিন বলেন, এই কঠিন সময়ে ইরানের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে রাশিয়া। দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পণ্যও সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকেই তেহরানের পাশে রয়েছে মস্কো। রাশিয়া পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাস্পিয়ান সাগর হয়ে ইরানে ড্রোন তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাঠানোর কথাও জানা গেছে।
কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও পরস্পরের ওপর হামলা শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে তেহরানের প্রতি মস্কোর প্রকাশ্য সমর্থন সংঘাতকে আরও আন্তর্জাতিক মাত্রা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
পুতিনের বক্তব্যেও সেই অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তিনি ইরানের পাশে থাকার পাশাপাশি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যেকোনো চাপ বা আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানান।
বিশকেকে নিজের বক্তব্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পুতিন সোভিয়েত আমলের একটি উপমা টেনে আনেন। তিনি বলেন, সে সময় পশ্চিমা দেশগুলোকে ‘সাম্রাজ্যবাদের হাঙর’ হিসেবে বর্ণনা করা হতো।
পুতিনের ভাষ্য, কেউ যদি রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক খাদ্যশৃঙ্খলের আরও নিচে নামিয়ে দিতে চায়, দেশটিকে গিলে খেতে বা গ্রাস করতে চায়, তাহলে রাশিয়ার কাছ থেকে ‘দাঁতভাঙা’ জবাব পেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এসব ‘হাঙরের’ ক্ষুধা ও দাঁত দ্রুত বাড়লেও রাশিয়া তাদের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত।
ইরান ইস্যুর পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন পুতিন। তার বক্তব্যের সময় যুদ্ধ আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আকাশপথে হামলা বাড়িয়েছে।
পুতিন জানান, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় ব্যাপক হামলা চালানোর নির্দেশ রুশ বাহিনীকে দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, এসব হামলার কারণে ইউক্রেনের কৃষিপণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশটি আর্থিক সংকটের ঝুঁকিতে পড়ছে।
তবে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি ইউক্রেনের অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলছেন না। কিন্তু পরিস্থিতি দেশটির জন্য একটি ‘গুরুতর চ্যালেঞ্জ’ হয়ে উঠতে পারে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি বলেছেন, ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ায় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপদ থাকবে না।
জেলেনস্কির এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পুতিন এটিকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যায়িত করেন।
তিনি দাবি করেন, ইউক্রেন আবার রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে চাইছে এবং ব্যক্তিগত বৈঠকের অনুরোধও করছে। তবে একই সঙ্গে পুতিন বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনা হয় না।’
ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে শান্তি আলোচনার প্রসঙ্গেও পুতিন ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কাজ করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলে জানান।
পুতিন বলেন, রাশিয়া ওই দুই ব্যক্তিকে ভালোভাবে চেনে এবং সাধারণভাবে তাদের ওপর আস্থা রাখে। তার মতে, ট্রাম্পও তাদের ওপর আস্থা রাখেন এবং তারা সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
এর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ বিরল এক সফরে মস্কো যান। সেখানে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি।
র্যাটক্লিফের সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পুতিন বলেন, স্নায়ুযুদ্ধের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ সময়েও রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তবে বর্তমানে এ ধরনের যোগাযোগ ‘কিছুটা হলেও স্থগিত’ রয়েছে বলে জানান তিনি।
ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে রাশিয়ায় চলতি মাসের শেষ দিকে পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার পর নতুন করে সেনা নিয়োগ বা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে পুতিন এ ধরনের খবরকে সরাসরি ‘আজেবাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যোগাযোগ—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একই সময়ে পুতিনের বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মস্কোর অবস্থান আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।