একদিকে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে হিমবাহ ধস। মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেছে পাহাড়ি জনপদের চিত্র। প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজারেরও বেশি মানুষ, এখনো নিখোঁজ কয়েক হাজার। এমন এক বিপর্যয়ের পর এবার আর শুধু সহায়তা নয়—জলবায়ু ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে নেপাল। দেশটির অভিযোগ, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, সেই ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দেশগুলোর কাছ থেকেই ক্ষতিপূরণ […]
ছবি: সংগৃহীত
একদিকে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে হিমবাহ ধস। মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেছে পাহাড়ি জনপদের চিত্র। প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজারেরও বেশি মানুষ, এখনো নিখোঁজ কয়েক হাজার। এমন এক বিপর্যয়ের পর এবার আর শুধু সহায়তা নয়—জলবায়ু ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে নেপাল।
দেশটির অভিযোগ, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, সেই ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দেশগুলোর কাছ থেকেই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নৈতিক ও ঐতিহাসিক অধিকার রয়েছে নেপালের।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল স্পষ্ট করে বলেছেন, এই দাবি কোনো করুণার আবেদন নয়; বরং এটি নৈতিক ও আইনগত দায়িত্বের প্রশ্ন।
গত ২৬ আগস্ট চীন সীমান্তবর্তী নেপালের রসুয়া জেলায় হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। আকস্মিক এই দুর্যোগে নেপাল ও চীনের অংশ মিলিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ১ হাজার ১৩০ জন।
এর মধ্যে নেপালে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১১৪ জন। চীনের অংশে প্রাণ গেছে আরও ১৬ জনের। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এখনো প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, হিমবাহ ধসের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটে। ওই সময় বৃষ্টিপাত না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারাও কোনো আগাম সতর্কবার্তা পাননি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল এই আকস্মিক বিপর্যয়কে ‘পাহাড়ি সুনামি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
কান্তিপুর টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খানাল বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য চার শতাংশ। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হয়েও নেপালকে বিপর্যয়ের বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।
তার ভাষায়, যেসব দেশ বৈশ্বিক নির্গমনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে, তাদের নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রতি ঐতিহাসিক দায় রয়েছে।
এ কারণেই নেপাল এখন জলবায়ু কূটনীতির ক্ষেত্রে নতুন অবস্থান নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহযোগীদের কাছ থেকে শুধু অনুদান বা সহায়তা নেওয়ার বদলে জলবায়ু ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি তুলতে চাইছে দেশটি।
শিশির খানাল বলেন, জলবায়ু বিপর্যয়ের পর নেপালের প্রয়োজনকে শুধু মানবিক সহায়তার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দায়বদ্ধতার প্রশ্নও।
তিনি বলেন, ‘এটি কোনো করুণার বিষয় নয়; এটি আইনগত ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়।’
নেপাল ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সহযোগীদের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামেও বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি।
ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ৬১ দশমিক ৮ শতাংশের জন্য চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া—এই ছয়টি দেশ ও অঞ্চল যৌথভাবে দায়ী ছিল।
তবে জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্নে ভারতের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। দেশটি বরাবরই মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ তুলনামূলক কম হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে আসছে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর দাবিও জানিয়ে আসছে ভারত।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের বিশেষজ্ঞ শাস্বত স্যান্যাল এবং জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচক মনজিৎ ধকালও নেপালের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
তাদের মতে, বৈশ্বিক মোট কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান শূন্য দশমিক এক শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশটি একের পর এক ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে।
তারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার পাশাপাশি দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসের পর নেপালের দাবি তাই শুধু অর্থনৈতিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশটি বলছে, জলবায়ু সংকট তৈরিতে যাদের ভূমিকা বেশি, ক্ষতির বোঝা বহনকারী দেশগুলোর প্রতি তাদের দায়িত্বও বেশি।
এই অবস্থান থেকেই ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছে কাঠমান্ডু। সামনে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় নেপালের এই দাবি কতটা জোরালো অবস্থান তৈরি করতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।