সুন্দরবনের কাছাকাছি রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আর্থিকভাবে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে যুক্তরাজ্যের অন্যতম বড় ব্যাংক বার্কলেসের বিরুদ্ধে। পরিবেশ ও মানবাধিকার ঝুঁকি যথাযথভাবে যাচাই না করেই প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলের তিন ব্যক্তি ও সংগঠন যুক্তরাজ্য সরকারের অফিস ফর রেসপন্সিবল বিজনেস কন্ডাক্টে অভিযোগটি […]
ছবি: সংগৃহীত
সুন্দরবনের কাছাকাছি রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আর্থিকভাবে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে যুক্তরাজ্যের অন্যতম বড় ব্যাংক বার্কলেসের বিরুদ্ধে। পরিবেশ ও মানবাধিকার ঝুঁকি যথাযথভাবে যাচাই না করেই প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলের তিন ব্যক্তি ও সংগঠন যুক্তরাজ্য সরকারের অফিস ফর রেসপন্সিবল বিজনেস কন্ডাক্টে অভিযোগটি জমা দিয়েছেন। এখন সংশ্লিষ্ট দপ্তর যাচাই করবে, অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের জন্য গ্রহণ করা হবে কি না।
অভিযোগকারীদের দাবি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সুন্দরবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিবেশব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তাদের অভিযোগ, এসব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ যাচাই না করেই বার্কলেস প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রমে সহায়তা করেছে।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ‘মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট’ নামেও পরিচিত। প্রকল্পটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) যুক্ত রয়েছে। এর অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এনটিপিসি লিমিটেড।
অভিযোগকারীদের সহায়তাকারী কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, বার্কলেস এনটিপিসির ঋণ আন্ডাররাইটিং করেছে। পাশাপাশি ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের বন্ড ইস্যুতেও ব্যাংকটির আন্ডাররাইটিং সেবার কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ব্যাংক রামপাল প্রকল্পে ঋণ দিয়েছিল।
অভিযোগকারীরা বলছেন, এ ধরনের আর্থিক সেবা দেওয়ার আগে প্রকল্পটির পরিবেশগত ও মানবাধিকার ঝুঁকি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা উচিত ছিল।
ঢাকাভিত্তিক পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল এই অভিযোগকারীদের একজন। তার দাবি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আশপাশের শিল্পকারখানা থেকে ভারী ধাতুর দূষণ নদী ও খালের মাধ্যমে সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করছে।
বিশেষ করে পশুর নদীর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবনের এই গুরুত্বপূর্ণ নদীর তীরে অবস্থিত এবং বনটির স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণার কথাও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। ওই গবেষণায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকার পানিতে পারদ ও আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি ঘনত্বের সন্ধান মেলে পশুর নদীতে।
গবেষকেরা শিল্পবর্জ্য ও বন্দরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডকে ভারী ধাতু দূষণের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে কয়লা পোড়ানোর নির্গমন এবং নৌযান চলাচল বৃদ্ধির কারণে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সুন্দরবনের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
শুধু স্থানীয় দূষণ নয়, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা পোড়ানোর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
তাদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়সহ চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিতে এমনিতেই রয়েছে সুন্দরবন অঞ্চল। ম্যানগ্রোভ বনটি এসব দুর্যোগের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবেও কাজ করে।
সুন্দরবন শুধু একটি বনাঞ্চল নয়; বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও এটি সরাসরি জড়িত। মাছ ধরা, বনজ সম্পদ সংগ্রহসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করেন স্থানীয় বহু মানুষ।
একই সঙ্গে সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল এবং ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। এখানে বেঙ্গল টাইগারসহ বহু প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল রয়েছে।
শরীফ জামিলের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। পরিবেশ ও মানুষের ওপর সেই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তার দাবি, অন্য কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান রামপাল প্রকল্প থেকে দূরে সরে গেছে কিংবা অর্থায়নে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। এ অবস্থায় বার্কলেসসহ অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের নীতি নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত।
জামিল জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, বাংলাদেশে সারা বছর পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায় এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কিংসের হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের আইনজীবী সু উইলম্যান বলেন, সুন্দরবন এলাকার গ্রামীণ জনগোষ্ঠী জলবায়ু ও প্রকৃতির সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তেল ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে অর্থায়নের আগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন সম্ভাব্য পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতি বিবেচনায় নেয়—এটাই তাদের উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
অভিযোগের বিষয়ে বার্কলেস ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। একইভাবে রামপাল প্রকল্পের হোল্ডিং কোম্পানি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডও অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
এখন যুক্তরাজ্যের অফিস ফর রেসপন্সিবল বিজনেস কন্ডাক্ট অভিযোগটি পর্যালোচনা করবে। এরপর তারা সিদ্ধান্ত নেবে, বিষয়টি আনুষ্ঠানিক তদন্তের জন্য গ্রহণ করা হবে কি না।
সুন্দরবনকে ঘিরে পরিবেশগত উদ্বেগ, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকের অর্থায়নের ভূমিকা—সব মিলিয়ে এই অভিযোগ সামনে আসায় রামপাল প্রকল্প নিয়ে পুরোনো বিতর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।