যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আদালতে নিজেদের পক্ষে আইনজীবী ছাড়া লড়তে হচ্ছে অনেক অভিবাসী শিশুকে। এতে দেশটিতে থাকা হাজার হাজার অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কের নির্বাসনের ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন আইনজীবী ও অধিকারকর্মীরা। দীর্ঘদিন ধরে এসব শিশুকে আইনি সহায়তা দেওয়া একটি জাতীয় নেটওয়ার্কের সরকারি অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সম্প্রতি লুইজিয়ানার একটি অভিবাসন আদালতে এক বছরের […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আদালতে নিজেদের পক্ষে আইনজীবী ছাড়া লড়তে হচ্ছে অনেক অভিবাসী শিশুকে। এতে দেশটিতে থাকা হাজার হাজার অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কের নির্বাসনের ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন আইনজীবী ও অধিকারকর্মীরা। দীর্ঘদিন ধরে এসব শিশুকে আইনি সহায়তা দেওয়া একটি জাতীয় নেটওয়ার্কের সরকারি অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
সম্প্রতি লুইজিয়ানার একটি অভিবাসন আদালতে এক বছরের একটি শিশু টলতে টলতে ঘুরছিল এবং কাঁদছিল। একপর্যায়ে সে একটি খেলনা ছুড়ে দেয়, যা অল্পের জন্য একজন সরকারি কৌঁসুলির গায়ে লাগেনি। শিশুটির ১৭ বছর বয়সী মাকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে বলেন বিচারক। কিন্তু আটক অবস্থায় থাকা ওই কিশোরী মা এতটাই অস্থির ছিলেন যে বিচারকের নির্দেশনা ঠিকমতো বুঝে ওঠাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছিল।
আগস্টে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন অভিভাবকহীন অভিবাসী শিশুদের আইনি সহায়তা দেওয়া সংগঠনের উপপরিচালক রক্সানা আভিলা-সিম্পিয়ানু। এএফপিকে তিনি বলেন, ওই কিশোরীর কাছ থেকে একই সঙ্গে নিজের জন্য এবং এক বছরের শিশুটির জন্য আশ্রয়ের আবেদন করার পদ্ধতি বের করে নেওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। অথচ তিনি নিজেই আটক অবস্থায় থাকা এক তরুণ মা এবং চরম মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন।
অভিবাসন-আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকহীন অভিবাসী শিশুদের আইনি সহায়তা দিয়ে আসা অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোর সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের পরিবর্তে কম অভিজ্ঞ বা এ ধরনের মামলায় পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই—এমন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা চলতি সপ্তাহে স্বাস্থ্য ও মানবসেবা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এক চিঠিতে বলেন, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব এমন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হচ্ছে, যাদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক বলতে সাধারণত এমন শিশুদের বোঝানো হয়, যারা কোনো প্রাপ্তবয়স্ক অভিভাবক ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে। এমন শিশুরাও এর আওতায় পড়ে, যাদের বাবা-মাকে অভিবাসন কর্মকর্তারা আটক করেছেন এবং যারা পরে আশ্রয়কেন্দ্র বা সরকারি হেফাজতে রয়েছে। এসব শিশুদের দেখভালের দায়িত্ব ঐতিহ্যগতভাবে স্বাস্থ্য ও মানবসেবা মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস অব রিফিউজি রিসেটলমেন্টের (ORR)।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের বহিষ্কারে কঠোর অভিযান শুরু করে। একই সময়ে অভিবাসন আদালতে থাকা শিশুদের আইনি সহায়তা নিয়েও নতুন করে সংকট তৈরি হয়।
গত ৩১ জুলাই ORR-এর অধীনে অভিভাবকহীন শিশুদের আইনি সেবা দেওয়া Acacia Center for Justice-এর সঙ্গে ফেডারেল সরকারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এর মাধ্যমে দেশজুড়ে প্রায় ১০০টি আইনি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক কার্যত ভেঙে পড়ে। ওই নেটওয়ার্ক ২০ হাজারের বেশি অভিবাসী শিশুকে আইনি প্রতিনিধিত্ব দিচ্ছিল।
Acacia-এর পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার পাওনা ছিল। একই সঙ্গে চুক্তি অব্যাহত রাখার শর্ত হিসেবে শিশুদের গোপনীয় তথ্য সরকারের কাছে হস্তান্তরের দাবি করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি সেই শর্তে রাজি না হওয়ায় চুক্তি নবায়ন হয়নি বলে Acacia-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এর আগে ফেডারেল আদালত সরকারকে আইনি সেবা প্রদানকারীদের বকেয়া অর্থ পরিশোধের নির্দেশও দেয়। আদালতের ওই আদেশে বলা হয়, কংগ্রেসের বরাদ্দ করা অর্থ আটকে রেখে শিশুদের আইনি সহায়তা ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।
এরপর সরকার বিকল্প ব্যবস্থায় যাওয়ার উদ্যোগ নেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন একটি ছোট আইন প্রতিষ্ঠান Burke Law Group-কে বড় অঙ্কের চুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি পরে ওই চুক্তির জন্য আবেদন প্রত্যাহার করে। এরপর USCRI-কে অভিবাসন আদালতে শিশুদের পক্ষে আইনি সহায়তার দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
সরকার পরে Our Rescue নামের একটি প্রতিষ্ঠানকেও বড় অঙ্কের চুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা টিম ব্যালার্ড সাবেক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা এবং মানবপাচারবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে পরবর্তীতে যৌন পাচারের অভিযোগ ওঠে এবং তিনি প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে দেন।
আইনজীবীদের মতে, অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের অভিবাসন আদালতে নিজেদের পক্ষে লড়াই করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক শিশু ইংরেজি জানে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের জটিল অভিবাসন আইন সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাও থাকে না। ফলে এ ধরনের মামলায় অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ।
আভিলা-সিম্পিয়ানু ২০১৮ সালের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেন, তখন তার সংগঠন কয়েক মাস বয়সী একটি শিশুর হয়ে আদালতে উপস্থিত হয়েছিল।
তখন আদালতে বলতে হয়েছিল, ‘এই শিশু অভিযোগ অস্বীকার করছে। এই শিশু স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যেতে চায়।’
তিনি বলেন, শিশুদের এমনভাবে আচরণ করা হচ্ছে যেন তারা প্রাপ্তবয়স্ক এবং নিজেদের অভিবাসন মামলার আইনি সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারে। অথচ তারা বাস্তবে এসব প্রক্রিয়া বোঝার বয়সে পৌঁছায়নি।
এ সপ্তাহে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেক্সাসের একটি আদালতে ২৫ জন অভিবাসী শিশুর শুনানি হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের কোনো আইনজীবী ছিল না।
তবে ORR এএফপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, আগস্টে তারা বছরের শেষ পর্যন্ত ইউএস কমিটি ফর রিফিউজিস অ্যান্ড ইমিগ্র্যান্টসকে (USCRI) অর্থায়ন করেছে, যাতে প্রতিষ্ঠানটি অভিবাসন আদালতে শিশুদের পক্ষে উপস্থিত থাকতে পারে। ORR-এর দাবি, USCRI সব শুনানিতে উপস্থিত থাকার পাশাপাশি আইনি পরামর্শ, দিকনির্দেশনা এবং সরাসরি আইনি প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
Acacia-এর মুখপাত্র বিলাল আসকারিয়ার অবশ্য এই ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার ভাষ্য, USCRI তুলনামূলকভাবে ছোট প্রতিষ্ঠান এবং সেখানে প্রায় ৫০ জন আইনজীবী রয়েছেন। বিপরীতে Acacia-এর জাতীয় নেটওয়ার্কে আইনজীবীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০০।
Acacia-এর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যেসব শিশু আইনি প্রতিনিধিত্ব পেত, তাদের অনেকেই সহিংসতা, পাচার, নির্যাতন বা নিপীড়নের অভিজ্ঞতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে। আইনজীবীরা তাদের শুধু আদালতে প্রতিনিধিত্বই করতেন না, বরং কারা আশ্রয়, বিশেষ অভিবাসন সুবিধা বা অন্য কোনো আইনি সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য হতে পারে, সেটিও শনাক্ত করতে সহায়তা করতেন।
Acacia-এর তথ্যমতে, আইনজীবী থাকা শিশুদের আদালতে হাজিরার হারও বেশি। প্রতিষ্ঠানটির কর্মসূচির মাধ্যমে ২৬ হাজারের বেশি শিশুকে বিভিন্ন ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।
আভিলা-সিম্পিয়ানুর অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের আইনি লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। তার মতে, এতে দ্রুততার সঙ্গে বেশি সংখ্যক শিশুকে বহিষ্কারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
Acacia-এর মুখপাত্র বিলাল আসকারিয়ার বলেন, বিষয়টি কোনো একটি প্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যকার বিরোধ নয়। তার ভাষায়, মূল প্রশ্ন হলো সেই ২০ হাজারের বেশি শিশুর ভবিষ্যৎ, যারা নিরাপত্তার আশায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আদালতে আইনজীবী ছাড়া শিশুদের শুনানির সংখ্যা বাড়তে থাকলে তাদের আইনি অধিকার ও যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ আইনি সহায়তা ছাড়া এসব শিশু নির্বাসনের সিদ্ধান্তের মুখে পড়বে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।