শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও কে ধারণ করেছিলেন, কীভাবে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং এ ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে কীভাবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসে—এসব বিষয় নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দৈনিক আমার দেশ। ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে পত্রিকাটি দাবি করে, শেখ হাসিনার […]
ছবি: আমার দেশ অনলাইন
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও কে ধারণ করেছিলেন, কীভাবে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং এ ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে কীভাবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসে—এসব বিষয় নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দৈনিক আমার দেশ।
২০২৫ সালের ৪ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে পত্রিকাটি দাবি করে, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্য ধারণ ও প্রচারের ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কথিত নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বিমান বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা এবং পুলিশের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে অভিযোগগুলোর সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একই প্রতিবেদনে বিমান বাহিনীর ছয় কর্মকর্তার অবসরের বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) ভিন্ন বক্তব্যও রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই ভিডিও কীভাবে ধারণ করা হয়েছিল এবং কে সেটি প্রকাশ করেছিলেন, তা নিয়ে তদন্তের সূত্র ধরে বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরে অনুসন্ধান শুরু হয় বলে জানিয়েছে আমার দেশ।
পত্রিকাটির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান বাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটির অফিসার্স মেসের একটি কক্ষ থেকে নিজের মুঠোফোনে ওই দৃশ্য ধারণ করেছিলেন। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের সঙ্গে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সুরির সংশ্লিষ্টতার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আমার দেশ-এর দাবি, ভিডিও ধারণের স্থান ও ক্যামেরার অবস্থান বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মুঠোফোনের তথ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে তদন্তকারীরা স্কোয়াড্রন লিডার আবদুল্লাহ ইবনে আলতাফের সঙ্গে একটি যোগসূত্র খুঁজে পান। এরপর তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আমার দেশ-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্কোয়াড্রন লিডার আবদুল্লাহ ইবনে আলতাফের বিরুদ্ধে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর হয়ে কাজ করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। পত্রিকাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তাঁকে আটক করা হয় এবং পরে সামরিক আদালতে তাঁর ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে অস্ত্র, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধারের তথ্য তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব উদ্ধারের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।
আবদুল্লাহ ইবনে আলতাফ বর্তমানে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে কারাগারের তৎকালীন সিনিয়র জেল সুপারের বক্তব্যও প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি। তিনি জানান, বিমান বাহিনী আইনের অধীনে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে ওই কর্মকর্তার ১০ বছরের সাজা হয়েছে।
বিমান বাহিনীর ছয়জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘র’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে তাঁদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছে আমার দেশ। প্রতিবেদনে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁরা হলেন এয়ার ভাইস মার্শাল এম এ আউয়াল হোসেন, এয়ার ভাইস মার্শাল জাহিদুল সাঈদ, এয়ার কমডোর মোহাম্মদ আমিনুল হক, গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল্লাহ আল ফারুক, গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শামীম এবং উইং কমান্ডার সাইয়েদ মোহাম্মদ।
তবে এ বিষয়ে আইএসপিআরের তৎকালীন পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি-উদ-দৌলা চৌধুরী আমার দেশকে জানিয়েছিলেন, ওই ছয় কর্মকর্তা স্বাভাবিক অবসরে গেছেন।
ফলে কর্মকর্তাদের অবসরের কারণ নিয়ে পত্রিকাটির দাবি ও আইএসপিআরের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত তথ্য প্রয়োজন।
বিমান বাহিনীর কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছে আমার দেশ। প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন কয়েকজন কর্মকর্তা এবং পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিটের একজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের তৎকালীন সহকারী কমিশনার ইফতেখার মাহমুদের গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পত্রিকাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ইফতেখার মাহমুদের সঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে আলতাফের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
আমার দেশ জানায়, ইফতেখার মাহমুদের স্ত্রী তাঁর স্বামীর খোঁজ না পেয়ে পুলিশ কমিশনারের কাছে আবেদন করেছিলেন। পরে পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তির বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ ছাড়া সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
আমার দেশ-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ ও প্রকাশের ঘটনা থেকে শুরু করে বিমান বাহিনী ও পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ছয় কর্মকর্তার অবসরের কারণ নিয়ে আইএসপিআরের বক্তব্যও সামনে এসেছে।
বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে সংশ্লিষ্ট তদন্তের নথি, সামরিক আদালতের রায়ের বিস্তারিত তথ্য, অবসরের সরকারি আদেশ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ‘বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরের ‘র’ নেটওয়ার্ক ফাঁস’, প্রকাশিত ৪ আগস্ট ২০২৫।
মূল প্রতিবেদন: https://www.dailyamardesh.com/amar-desh-special/amdzsb26nvuap