যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা গ্রহণের কারণে গ্রিন কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অভিবাসীদের মধ্যে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ‘পাবলিক চার্জ’ বিধিতে অভিবাসন কর্মকর্তাদের সরকারি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। মেডিকেইড, খাদ্য সহায়তা, সরকারি আবাসনসহ বিভিন্ন আয়ভিত্তিক সুবিধা এখন গ্রিন কার্ড আবেদনের […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা গ্রহণের কারণে গ্রিন কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অভিবাসীদের মধ্যে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ‘পাবলিক চার্জ’ বিধিতে অভিবাসন কর্মকর্তাদের সরকারি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। মেডিকেইড, খাদ্য সহায়তা, সরকারি আবাসনসহ বিভিন্ন আয়ভিত্তিক সুবিধা এখন গ্রিন কার্ড আবেদনের মূল্যায়নে বিবেচিত হতে পারে। তবে কোনো সরকারি সুবিধা গ্রহণ করলেই আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে, এমন নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) গত ২০ জুলাই ২০২৬ নতুন চূড়ান্ত বিধি প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে ২০২২ সালে চালু হওয়া আগের পাবলিক চার্জ বিধির বড় অংশ বাতিল করা হয়। পরে ১৮ আগস্ট ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করে। ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন বিধি কার্যকর হয়েছে।
৫ নভেম্বর প্রকাশিত স্বাস্থ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেএফএফের (KFF) এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন নির্দেশনায় কোন কোন সরকারি সুবিধা বিবেচনায় আসতে পারে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হয়নি। ফলে অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে বিস্তৃত বিবেচনার সুযোগ থাকলেও অভিবাসী পরিবারগুলো ঠিক কোন সুবিধা তাদের গ্রিন কার্ড আবেদনে প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
কোন কোন সরকারি সুবিধা বিবেচনায় আসতে পারে
নতুন নির্দেশনায় আয় বা সম্পদের নির্দিষ্ট সীমার ভিত্তিতে দেওয়া সরকারি সুবিধাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
তবে এসব সুবিধার নাম উল্লেখ থাকলেই প্রতিটি আবেদনকারীর ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্ত হবে, এমন নয়। সুবিধাটি কীভাবে দেওয়া হয়েছে, আবেদনকারীর আর্থিক ও পারিবারিক পরিস্থিতি কী এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য কী—সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কোন সুবিধাগুলো পাবলিক চার্জের আওতায় পড়ছে না
নতুন নির্দেশনায় সামাজিক নিরাপত্তা (Social Security), মেডিকেয়ার (Medicare) এবং বেকারত্ব ভাতা (Unemployment Insurance)-এর মতো সুবিধাকে আয়ভিত্তিক সরকারি সহায়তা হিসেবে গণ্য করা হয়নি। এসব সুবিধার যোগ্যতা সাধারণত কর্মজীবনে জমা দেওয়া অর্থ বা অবদানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
এ ছাড়া সবার জন্য উন্মুক্ত কিছু কর্মসূচি, যেমন কোনো স্কুলে সব শিক্ষার্থীর জন্য চালু থাকা সার্বজনীন বিনা মূল্যের খাবার কর্মসূচি, সাধারণভাবে এই মূল্যায়নের আওতায় পড়বে না বলে নির্দেশনায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
কোন বিষয়গুলো দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন অভিবাসন কর্মকর্তারা
ইউএসসিআইএসের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো আবেদনকারী ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন কি না, তা নির্ধারণে কর্মকর্তাদের একাধিক বিষয় বিবেচনা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
১. আবেদনকারীর বয়স।
২. শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত পরিস্থিতি।
৩. পারিবারিক অবস্থা।
৪. সম্পদ, আর্থিক সামর্থ্য ও আয়ের অবস্থা।
৫. শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা।
এ ছাড়া প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আবেদনকারীর পক্ষে জমা দেওয়া আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার অঙ্গীকারপত্র বা অ্যাফিডেভিট অব সাপোর্ট (Form I-864) বিবেচনা করা হতে পারে।
অর্থাৎ, কোনো একটি সরকারি সুবিধা গ্রহণের তথ্যের ভিত্তিতেই গ্রিন কার্ডের আবেদন নাকচ করার কথা নয়। আবেদনকারীর সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিটি মামলা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
পরিবারের সদস্য সরকারি সহায়তা নিলে কী হবে
নতুন নির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পরিবারের অন্য সদস্যের সরকারি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিবেচনায় আসতে পারে। তবে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা অন্য আত্মীয় কোনো সরকারি সুবিধা পেলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রিন কার্ড আবেদনকারীর নিজের সুবিধা গ্রহণ হিসেবে গণ্য হবে না।
কেএফএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আবেদনকারী আইনগতভাবে যেসব পরিবারের সদস্যকে সহায়তা দিতে বাধ্য এবং যাদের সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা আবেদনকারীর আয় বা সম্পদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যের সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি কর্মকর্তারা বিবেচনা করতে পারেন।
তবে এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনায় কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সন্তানদের সরকারি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গ্রিন কার্ডের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম আই-৪৮৫-এ আবেদনকারীর নিজের সুবিধা গ্রহণের তথ্য জানতে চাওয়া হলেও পরিবারের সদস্যদের সুবিধা নিয়ে সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হতে পারে বলে কেএফএফ উল্লেখ করেছে।
১৮ সেপ্টেম্বরের আগে ও পরে সুবিধা গ্রহণের পার্থক্য
নতুন নিয়মের ক্ষেত্রে সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর আগে পাওয়া সরকারি সুবিধার ক্ষেত্রে আগের ২০২২ সালের নিয়ম অনুসরণ করা হবে। সে সময় মূলত আয় বজায় রাখার জন্য নির্দিষ্ট ধরনের নগদ সহায়তা এবং সরকারের ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যা গ্রহণের বিষয় বিবেচনায় আসত।
অন্যদিকে, ১৮ সেপ্টেম্বর বা তার পরে পাওয়া আয়ভিত্তিক সরকারি সুবিধা নতুন নিয়মে বিবেচিত হতে পারে। এমনকি কোনো সুবিধা আগে অনুমোদিত হলেও সেটি যদি ১৮ সেপ্টেম্বরের পরও চালু থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তা মূল্যায়নে আসতে পারে। সুবিধা বন্ধ বা প্রত্যাহার করা হলে তার প্রমাণ দেখানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর বা তার পরে ইউএসসিআইএসে জমা দেওয়া এবং পাবলিক চার্জ বিধির আওতাভুক্ত গ্রিন কার্ড আবেদনগুলোর ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হবে। এর আগে যথাযথভাবে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর ক্ষেত্রে আগের নিয়ম কার্যকর থাকবে।
কারা পাবলিক চার্জ মূল্যায়ন থেকে অব্যাহতি পাবেন
সব অভিবাসন আবেদনকারীর ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ইউএসসিআইএসের নির্দেশনায় কয়েকটি শ্রেণির আবেদনকারীকে পাবলিক চার্জ মূল্যায়ন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন—
এ তালিকা আরও বিস্তৃত। তাই নিজের অভিবাসন শ্রেণি অনুযায়ী অব্যাহতি প্রযোজ্য কি না, তা সরকারি নির্দেশনা থেকে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
কেএফএফের আশঙ্কা: স্বাস্থ্য ও খাদ্য সহায়তা থেকে সরে আসতে পারেন লাখো মানুষ
নতুন নিয়মের অস্পষ্টতা শুধু গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি করেনি; এর প্রভাব পড়তে পারে অভিবাসী পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপরও। কেএফএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকারি সুবিধা গ্রহণের কারণে অভিবাসন-সংক্রান্ত জটিলতার আশঙ্কায় অনেক পরিবার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্যবিমা, খাদ্য ও আবাসন সহায়তা থেকে দূরে থাকতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, নতুন নিয়ম ও অভিবাসনসংক্রান্ত অন্যান্য উদ্বেগের কারণে ১৪ লাখ থেকে ৪১ লাখ মানুষ মেডিকেইড বা শিশুদের স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করতে পারেন। এই সম্ভাব্য সংখ্যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক শিশুও রয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১৭ লাখ।
এ ছাড়া প্রায় ১৭ লাখ এমন মানুষ রয়েছেন, যারা মেডিকেইড বা শিশুদের স্বাস্থ্যবিমা পাওয়ার যোগ্য হলেও বর্তমানে তালিকাভুক্ত নন এবং তাঁদের পরিবারের অন্তত একজন সদস্য অ-মার্কিন নাগরিক। কেএফএফের অনুমান অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার থেকে ৪ লাখ ৯৮ হাজার মানুষ যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও নতুন করে এসব সুবিধার জন্য আবেদন করা থেকে বিরত থাকতে পারেন।
তবে এগুলো বাস্তবে সুবিধা ত্যাগ করা মানুষের সংখ্যা নয়; সম্ভাব্য প্রভাব বোঝাতে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ নাম প্রত্যাহারের বিভিন্ন পরিস্থিতি ধরে তৈরি করা গবেষণাভিত্তিক অনুমান।
আবেদনকারীদের জন্য কী গুরুত্বপূর্ণ
নতুন নিয়মে সরকারি সহায়তা গ্রহণের বিষয়টি আরও বিস্তৃতভাবে বিবেচিত হতে পারে। তবে আতঙ্কিত হয়ে হঠাৎ করে নিজের বা সন্তানের স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সহায়তা কিংবা অন্য কোনো সুবিধা বন্ধ করার আগে ব্যক্তিগত অভিবাসন পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে যাঁদের গ্রিন কার্ড আবেদন প্রক্রিয়াধীন, তাঁদের সুবিধার ধরন, সুবিধাটি কার নামে নেওয়া হয়েছে, কখন থেকে পাওয়া হচ্ছে এবং আবেদনকারীর অভিবাসন শ্রেণি—এসব বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
সরকারি নিয়ম ও নির্দেশনা জানতে ইউএসসিআইএসের ওয়েবসাইটে পাবলিক চার্জসংক্রান্ত নীতিমালা এবং ফর্ম আই-৪৮৫-এর সর্বশেষ নির্দেশনা দেখা যেতে পারে।
সূত্র: কেএফএফ (KFF), ইউএসসিআইএস (USCIS), যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (DHS)।