সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

ফিচার
২:৫৯ অপরাহ্ন, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপালে কাদাপানির নিচে ৯ দিন জীবিত ছিলেন দুই শ্রমিক, জানালেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

নেপালে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে একটি সুড়ঙ্গে টানা নয় দিন আটকে থেকেও জীবিত ফিরেছেন দুই জলবিদ্যুৎকর্মী। ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারপাশে কাদাপানি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কোনোভাবে প্রাণ ধরে রেখেছিলেন কবির মহরজন ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক বিভাগের ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ। উদ্ধারের পর হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পরও কিছু সময় বিভ্রান্ত ছিলেন কবির। এমনকি পাশে থাকা […]

নেপালে কাদাপানির নিচে ৯ দিন জীবিত ছিলেন দুই শ্রমিক, জানালেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

নেপালে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে একটি সুড়ঙ্গে টানা নয় দিন আটকে থেকেও জীবিত ফিরেছেন দুই জলবিদ্যুৎকর্মী। ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারপাশে কাদাপানি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কোনোভাবে প্রাণ ধরে রেখেছিলেন কবির মহরজন ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক বিভাগের ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ।

উদ্ধারের পর হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পরও কিছু সময় বিভ্রান্ত ছিলেন কবির। এমনকি পাশে থাকা স্ত্রী হীরা শোভাকেও চিনতে পারেননি তিনি। নয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফেরার পর তার শারীরিক অবস্থাও ছিল গুরুতর।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গত ২৬ আগস্ট নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার ওপর লাংটাং লিরুং পর্বতে একটি হিমবাহ ধসে পড়ে। এর ফলে ভয়াবহ ভূমিধস ও কাদাপানির ঢল নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে ভাটির বিভিন্ন এলাকা এবং একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক কাদাপানিতে তলিয়ে যায়।

নেপাল ও প্রতিবেশী চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতজুড়ে এই দুর্যোগে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং কয়েক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

কবির ছিলেন ঢলের মধ্যে আটকা পড়া কয়েকশ জলবিদ্যুৎকর্মীর একজন। তার সঙ্গে একটি কক্ষে আটকা পড়েছিলেন সঞ্জয় শাহ। কক্ষটিতে কিছুটা বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকায় তারা নয় দিন বেঁচে থাকতে সক্ষম হন বলে জানান উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া টানেল প্রকৌশলী ও আইনপ্রণেতা শ্রী রাম নেউপানে।

যেভাবে আটকা পড়েন কবির

দুর্যোগের দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে স্ত্রী হীরা শোভাকে ফোন করেছিলেন কবির। কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তিনি জানিয়েছিলেন, তাকে সুড়ঙ্গের ভেতরে যেতে হবে। সেখানে গেলে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না বলেও স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন তিনি।

এর প্রায় এক ঘণ্টা পর প্রায় ২৫ মাইল উজানে লাংটাং লিরুং পর্বতে হিমবাহ ধসে পড়ে। প্রবল ভূমিধসের সঙ্গে নেমে আসে বিশাল পানির ঢল। সেই ঢলে ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ডুবে যায়। প্রায় ৯০০ কর্মী ও শ্রমিক সেখানে আটকা পড়েন।

এদিকে কাঠমান্ডুতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। হঠাৎ একের পর এক স্টেশনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের মনিটরের পর্দা অন্ধকার হতে থাকে। প্রথমে কর্মকর্তারা এটিকে সাধারণ বন্যাজনিত সমস্যা মনে করলেও দ্রুত পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আপার ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে তখন আনুমানিক ৪০ জন কর্মী ছিলেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ততক্ষণে উজানে থাকা অন্তত দুটি প্রকল্পে ঢলের পানি আঘাত হানে।

সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে কবিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তার স্ত্রী হীরা। এর মাত্র দুই মিনিট পর প্রকল্পের কর্মকর্তারা কর্মীদের সরে যাওয়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দেন।

সঞ্জয় শাহ পরে উদ্ধারকারীদের জানান, তিনি নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে এক তলা থেকে আরেক তলায় ছুটে গিয়ে সহকর্মীদের সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে সুড়ঙ্গের বাইরে থাকা অনেক শ্রমিক প্রবল ঢলের সঙ্গে পেরে ওঠেননি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ভিডিওতে প্রায় ৩০ জন শ্রমিককে বিশাল ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে যেতে দেখা যায়।

উদ্ধার অভিযানে আশার আলো

শুরুতে উদ্ধারকারীরা ধারণা করেছিলেন, সুড়ঙ্গগুলো পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে ভেতরে কেউ জীবিত থাকার সম্ভাবনাও তারা খুব কমই দেখছিলেন।

তবে টানেল প্রকৌশলী শ্রী রাম নেউপানে তুলনামূলক ছোট একটি কেবল ডাক্টের দিকে নজর দেন। ঢালু হয়ে ওপরে ওঠা ওই সুড়ঙ্গে বন্যার পানি তুলনামূলক কম ছিল। পরে জানা যায়, সেখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন কবির ও সঞ্জয়। সুড়ঙ্গের মুখ থেকে প্রায় ১৬০ মিটার দূরে ছিল তাদের অবস্থান।

বন্যার পর প্রথম কয়েক দিন উদ্ধারকাজ চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো কাদা, পাথর, কাঠ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়ে যায়। কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ৩০ মিটার পুরু কাদামাটির স্তর তৈরি হয়েছিল।

উদ্ধারকারীরা ড্রিলিং, নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধীরে ধীরে পথ তৈরি করতে থাকেন।

একপর্যায়ে ওপর থেকে ড্রিল করে প্রায় পাঁচ ইঞ্চি ব্যাসের একটি গর্ত তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে সুড়ঙ্গের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয় এবং উদ্ধারকারীরা নির্দিষ্ট জায়গায় খনন চালানোর সুযোগ পান।

তবে টানা বৃষ্টিতে উদ্ধারকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। খনন করে তৈরি করা গর্তগুলোও পানি ও ধ্বংসাবশেষে আবার ভরে যাচ্ছিল। চাপা পড়া প্রবেশমুখে পৌঁছাতেই উদ্ধারকারীদের প্রায় ছয় দিন লেগে যায়।

নয় দিনের বন্দিজীবন

বাতাস চলাচল করা ছোট একটি কক্ষে নয় দিন আটকে ছিলেন কবির ও সঞ্জয়। সঞ্জয় সেখানে মনোবল ধরে রাখতে প্রার্থনা করতেন। অন্যদিকে কবির কাদাপানির মধ্যে শুয়ে থাকার সময় প্রাণ বাঁচাতে মাঝেমধ্যে অল্প অল্প করে সেই পানি পান করেছেন বলে পরে স্ত্রীকে জানান।

এদিকে স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে ভেঙে পড়েছিলেন হীরা। প্রকল্পের প্রবেশপথ ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে যাওয়ার ছবি দেখে তার মনে হয়েছিল, সেখানে কবিরের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তারপরও ১৫ ও ১০ বছর বয়সী দুই ছেলের সামনে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

উদ্ধারকারীরাও আশা ছাড়েননি। কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে বিভিন্ন জায়গায় আটকে থাকা বাতাসের পকেট কিছু কর্মীকে জীবিত রাখার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে তারা মনে করছিলেন।

মিলল জীবিত থাকার সংকেত

উদ্ধার অভিযানের দশম দিন ভোর ৪টার দিকে একজন অপারেটর জানান, সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে সম্ভবত কোনো শব্দ শোনা গেছে। সেটি মানুষের কণ্ঠ হতে পারে, আবার উদ্ধারকারীদের নিজেদের কণ্ঠের প্রতিধ্বনিও হতে পারে।

উদ্ধারকারী দলের নেতা গঙ্গা বরাল জানান, তারা ড্রিল চালানোর পাশাপাশি বারবার যন্ত্রের ইঞ্জিন বন্ধ করে ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে কি না শোনার চেষ্টা করেন। চিৎকার করে তারা জানতে চান, ভেতরে কেউ আছেন কি না।

একপর্যায়ে উদ্ধারকারীরা বুঝতে পারেন, শব্দের উৎস সম্ভবত মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিটার দূরে। এরপর কাদার ফাঁক দিয়ে একটি হাত দেখা যায়।

সকাল ৭টার মধ্যে উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের দেয়ালে একটি ছোট গর্ত তৈরি করতে সক্ষম হন। ভেতর থেকে তখন ভেসে আসে একটি শব্দ—‘হুনুহুনচা’, যার মোটামুটি অর্থ, ‘আমরা এখানে আছি।’

এরপর দ্রুত উদ্ধারকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।

‘ও নতুন জীবন পেয়েছে’

শেষ পর্যন্ত সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত অবস্থায় বের করে আনা হয় কবির ও সঞ্জয়কে। দুজনের কেউই তখন দাঁড়াতে পারছিলেন না। কাদায় ঢাকা সঞ্জয়কে একজন উদ্ধারকারী পিঠে করে বাইরে নিয়ে আসেন। আর গুরুতর আহত কবিরকে স্ট্রেচারে করে বের করা হয়।

স্বামীকে জীবিত উদ্ধারের খবর শুনে হীরা শোভার দুই ছেলে চিৎকার করে ওঠে, ‘মাম্মি, পাপা ফিরে এসেছে!’

কবিরের পায়ের গভীর ক্ষতে পরে অস্ত্রোপচার করা হয়। তার স্ত্রী জানান, ক্ষতটিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল।

হাসপাতালে স্বামীর কক্ষে ঢুকে হীরা দেখেন, কবির তাকে চিনতে পারছেন না। তবে এতে তার কোনো আক্ষেপ নেই। নয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে স্বামীকে জীবিত ফিরে পাওয়াটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়।

এর পরদিন আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আরেকটি সুড়ঙ্গ থেকে চীনা নাগরিক লু হাইতাওকেও জীবিত উদ্ধার করা হয়।

পরপর কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত ত্রিশূলী উপত্যকায় আটকে থাকা অন্যদেরও জীবিত উদ্ধারের আশা আরও জোরালো হয়েছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ