অতিরিক্ত গরমের কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এই ক্ষতির পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘A Livable Future: Protecting Jobs and Growth from Extreme Heat in South Asia’s […]
ছবি: সংগৃহীত
অতিরিক্ত গরমের কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এই ক্ষতির পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘A Livable Future: Protecting Jobs and Growth from Extreme Heat in South Asia’s Cities’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলেই শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা দ্রুত কমতে শুরু করে, যার ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে রাজধানী ঢাকায়। তাপপ্রবাহের কারণে প্রতিবছর শহরটিতে প্রায় ৩ শতাংশ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা হারানোর সমান। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে ঢাকায় উৎপাদনশীল সময়ের ক্ষতি বেড়ে ৭.৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ বিশ্লেষণের বরাতে বলা হয়েছে, কার্যকর তাপপ্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাত সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬৫.৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হারাতে পারে।
তবে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগের মাধ্যমে এই ক্ষতি কমানো সম্ভব বলেও উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড, আইএফসির পার্টনারশিপ ফর ক্লিনার টেক্সটাইলস কর্মসূচি এবং টেকসই অর্থায়ন শিল্প খাতকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে লিড (LEED) সনদপ্রাপ্ত তৈরি পোশাক কারখানার সংখ্যা ২৭০ ছাড়িয়ে গেছে, যা পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, অতিরিক্ত গরমের কারণে কারখানায় নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সমস্যায় পড়ছেন নারী শ্রমিকেরা। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে তাদের ওপর মানসিক চাপ, হয়রানি ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
প্রতিবেদন বলছে, এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বর্তমানে তাপপ্রবাহের কারণে অঞ্চলজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস চরম তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হবে, যা বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
প্রতিবেদনে গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ-এর তথ্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতে তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় এই হার প্রায় চার গুণ বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, তাপসহনশীল নগর গড়ে তোলা শুধু মানুষকে গরম থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান রক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
তিনি বলেন, এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ভবিষ্যতের জন্য আরও টেকসই, প্রতিযোগিতামূলক এবং বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
সূত্র: বিশ্বব্যাংক