রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মিমকে গাড়িচাপায় হত্যার ঘটনায় ১৭ বছরের এক কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়েছে আদালত। এরই মধ্যে নিহতের পরিবারের সঙ্গে গাড়ির মালিকপক্ষের ৯ লাখ টাকায় আপসের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর দাবি, সড়ক পরিবহন আইনে দায়ের হওয়া এ মামলা আপস করে নিষ্পত্তির সুযোগ নেই। বৃহস্পতিবার ঢাকার শিশু আদালত-৮-এর […]
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মিমকে গাড়িচাপায় হত্যার ঘটনায় ১৭ বছরের এক কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়েছে আদালত। এরই মধ্যে নিহতের পরিবারের সঙ্গে গাড়ির মালিকপক্ষের ৯ লাখ টাকায় আপসের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর দাবি, সড়ক পরিবহন আইনে দায়ের হওয়া এ মামলা আপস করে নিষ্পত্তির সুযোগ নেই।
বৃহস্পতিবার ঢাকার শিশু আদালত-৮-এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদির তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই কিশোরকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালতের শুনানি শেষে কিশোরের আইনজীবী আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের জানান, মেহেদীর পরিবারকে মোট ৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দাফন-কাফনের জন্য এক লাখ এবং তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে মামলার বাদী ও মেহেদীর ভাই মোক্তাদির ইসলাম আপসের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও কত টাকার বিনিময়ে আপস হয়েছে, তা তিনি জানেন না বলে জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, এ বিষয়ে তার মামা বিস্তারিত জানেন।
আপসনামায় গাড়ির মালিককে ‘প্রথম পক্ষ’ এবং মামলার বাদী মোক্তাদির ইসলামকে ‘দ্বিতীয় পক্ষ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে বলা হয়েছে, গত ২২ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টার দিকে গুলশান থানার বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক এলাকার ১ নম্বর সড়কে প্রথম পক্ষের একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে যায়। সেখানে বসে থাকা মেহেদী হাসান মিম গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়।
আপসনামায় বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার সময় গাড়িটি চালাচ্ছিলেন আকাশ মারক এবং গাড়িতে প্রথম পক্ষের আপন ছোট ভাই ছিলেন। দুর্ঘটনার পর নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে গুলশান থানায় মামলা করা হয়।
নথিতে ঘটনাটিকে ‘অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়, দুই পক্ষের মধ্যে আগে কোনো পরিচয় বা শত্রুতা ছিল না। দুর্ঘটনায় মেহেদীর পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির পাশাপাশি গাড়িচালক ও গাড়িতে থাকা ব্যক্তিও আহত হন এবং গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আপসনামা অনুযায়ী, মেহেদীর দাফন-কাফনসহ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে এক লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ, আপসনামায় মোট ৯ লাখ টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া মামলাটি প্রত্যাহারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং ১৭ বছরের কিশোর ও গাড়িচালক আকাশ মারকের জামিনের বিষয়ে বাদী পক্ষের অনাপত্তি বা সুপারিশের কথাও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় ব্যয় প্রথম পক্ষ বহন করবে এবং দ্বিতীয় পক্ষ এ বিষয়ে সহযোগিতা ও আদালতে উপস্থিত থাকবে বলেও আপসনামায় বলা হয়েছে।
আপসনামায় আরও বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি মেরামত কিংবা আহত গাড়িচালক ও গাড়িতে থাকা ব্যক্তির চিকিৎসার খরচ বাবদ দ্বিতীয় পক্ষের কাছে প্রথম পক্ষ কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করবে না।
একইভাবে গাড়িচালক আকাশ মারকের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো অভিযোগ বা আপত্তি না রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তীতে আদালত বা সালিশে কোনো অভিযোগ তোলা হলে তা অগ্রাহ্য করার শর্ত রাখা হয়েছে।
দুই পক্ষের মধ্যে ভবিষ্যতে আর কোনো আর্থিক লেনদেন বা তার প্রতিশ্রুতি থাকবে না এবং উভয় পক্ষ পরস্পরের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে ভবিষ্যতে একে অপরকে ক্ষতি বা হয়রানি করবে না বলেও আপসনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কোনো পক্ষ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে তা ‘অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণা’ হিসেবে বিবেচিত হবে বলেও নথিতে বলা হয়েছে।
আপসনামার বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার এসআই আরেফীন ইসলাম বলেন, আপসের বিষয়টি তার জানা নেই।
তদন্তে এর কোনো প্রভাব পড়বে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, আমরা আমাদের মতো তদন্ত করে যাব।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বলেন, সড়ক পরিবহন আইনে দায়ের করা এ মামলা আপসযোগ্য নয়। তার বক্তব্য, বাদী ও আসামিপক্ষের মধ্যে আপস হলেও আদালত সেটি গ্রহণ করতে বাধ্য নয়।
মেহেদীর মৃত্যুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে ওই কিশোরকে গাড়িতে দেখা গেছে এবং জানা যাচ্ছে, সে গাড়ি চালাচ্ছিল। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে এবং ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
গত মঙ্গলবার বিকাল ৫টার দিকে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মিম। এ সময় একটি দ্রুতগতির প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়।
পরে তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর স্থানীয়রা গাড়ির চালকের আসনে থাকা ১৭ বছরের কিশোরকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ওই রাতেই তাকে চাচার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
পরদিন মেহেদীর ভাই মোক্তাদির ইসলাম গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় গাড়িচালক আকাশ মারককে আসামি করা হলেও চালকের আসনে থাকা কিশোরের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হলে বুধবার পুলিশ ওই কিশোরকে গ্রেফতার করে। বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আরেফীন ইসলাম। শুনানি শেষে আদালত তাকে টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এরপর আদালতে কিশোরের আইনজীবীর বক্তব্যের মাধ্যমে নিহতের পরিবারের সঙ্গে গাড়ির মালিকপক্ষের ৯ লাখ টাকার আপসের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। তবে এই আপসনামা মামলার তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমে কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ধারণ হবে আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে।