গত দুই মাস ধরে ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্র এক বিশাল সামরিক সমাবেশ আয়োজন করেছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় ধরনের। ওয়াশিংটন এই উদ্যোগকে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করলেও, এর প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো ভেনেজুয়েলার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে […]
গত দুই মাস ধরে ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্র এক বিশাল সামরিক সমাবেশ আয়োজন করেছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় ধরনের। ওয়াশিংটন এই উদ্যোগকে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করলেও, এর প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো ভেনেজুয়েলার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক সমাবেশ শুধু মাদকবিরোধী অভিযান নয়, বরং এটি শক্তি প্রদর্শনের একটি স্পষ্ট সংকেত। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ছোট নৌযানে হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে হত্যা করেছে, যা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যাপক নিন্দার ঝড় তুলেছে। এর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছে।
লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের লাতিন আমেরিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার সাবাতিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক আগ্রাসনে না গিয়ে, সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে মাদুরো সরকারের ওপর ভয় চাপানোর চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে তারা ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী ও মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহলকে বিভক্ত করতে চায়, যাতে তারা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়।
মার্কো রুবিও ও ট্রাম্প প্রশাসনের ভেনেজুয়েলা নীতি
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মাদুরোকে ‘ভয়াবহ স্বৈরশাসক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য তারা কাজ করছে। তবে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে যাওয়ার ব্যাপারে এখনও যুক্তরাষ্ট্রের নীতি দ্বিধান্বিত। ২০১৬ সালে নির্বাচনী প্রচারণায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদেশি সরকার উৎখাতের নীতিতে পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তবে বর্তমানে ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনও মাদুরোকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল ও ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও স্বাধীন বলে মানেনি। মাদুরোর গ্রেপ্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৫ কোটি ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করলেও, অর্থনৈতিক প্রলোভনে ভেনেজুয়েলার অভিজাতদের মধ্যে ভাঙন ধরাতে পারেনি।
সেনাবাহিনী ও সরকারের ভবিষ্যত
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি হলো সেনাবাহিনী। তবে সেনারা কেবল তখনই মাদুরোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, যদি তাদের বিচার থেকে অব্যাহতি নিশ্চিত করা হয়। কারণ অনেকেই নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আশঙ্কায় সতর্ক। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইকেল আলবার্টাস বলেন, স্বৈরশাসক নেতারা সাধারণত তাদের ঘনিষ্ঠদেরও সন্দেহ করেন, তাই তারা নজরদারি বাড়িয়ে আনুগত্য নিশ্চিত করেন।
মাদকবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে অন্য লক্ষ্য
ট্রাম্প মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও, চ্যাথাম হাউসের সাবাতিনি মতানুযায়ী এটি আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মাদুরোর বিরোধীরা বলেন, ভেনেজুয়েলায় শুধু স্বৈরশাসন নয়, অপরাধী শাসনব্যবস্থাও বিদ্যমান। সামরিক বিশ্লেষকরা বলেন, এত বড় সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেও মাদক আটকানোর প্রয়োজন নেই, তাই এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য কাজ করছে।
সিআইএ ও গোপন অপারেশন সম্ভাবনা
সিআইএকে মাদুরোকে সরানোর জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প সরাসরি উত্তর দেননি। তবে তিনি সম্ভাব্য সামরিক অভিযানকে ইঙ্গিত করেছেন। লাতিন আমেরিকার অনেকেই সিআইএর উপর সন্দেহ পোষণ করেন, কারণ এর অতীত গোপন হস্তক্ষেপ ও ডানপন্থী সামরিক শাসকদের সমর্থনের ইতিহাস রয়েছে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-প্রতিনিধি নেড প্রাইস বলেন, সিআইএর অভিযান তথ্য সংগ্রহ, অর্থায়ন বা ধ্বংসাত্মক অপারেশনসহ বিভিন্ন রূপ নিতে পারে, এমনকি শাসনব্যবস্থা উৎখাত পর্যন্ত যেতে পারে।
এই পরিস্থিতি লাতিন আমেরিকার স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আরও তীব্র করতে পারে। এছাড়া, এই ধরনের হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন ও আঞ্চলিক শান্তির জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোও এই ধরনের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। তাই পাঠকদের জন্য বিষয়টি বোঝা জরুরি যে, শুধুমাত্র একটি দেশের রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির একটি অংশ।