নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায় বয়স্ক বাবা-মায়েদের হাতে ফলানো দেশি সবজি বিক্রির কয়েকটি ছবি ও ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দৃশ্যে রাস্তার পাশে ছোট পরিসরে লাউ, শসা, করলা, বেগুন, টমেটোসহ নানা ধরনের দেশি সবজি সাজিয়ে বিক্রি করতে দেখা যায় প্রবীণদের। ঘটনাগুলো প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে শ্রমের মর্যাদা, পরিবারের আর্থিক […]
ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায় বয়স্ক বাবা-মায়েদের হাতে ফলানো দেশি সবজি বিক্রির কয়েকটি ছবি ও ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দৃশ্যে রাস্তার পাশে ছোট পরিসরে লাউ, শসা, করলা, বেগুন, টমেটোসহ নানা ধরনের দেশি সবজি সাজিয়ে বিক্রি করতে দেখা যায় প্রবীণদের।
ঘটনাগুলো প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে শ্রমের মর্যাদা, পরিবারের আর্থিক বাস্তবতা এবং প্রবীণ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ববোধ নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে।
কমিউনিটির একাংশ মনে করছেন, সৎভাবে পরিশ্রম করে আয় করার মধ্যে অসম্মানের কিছু নেই। বাড়ির পেছনের বাগানে উৎপাদিত অতিরিক্ত সবজি নষ্ট না করে বিক্রি করা যেমন বাস্তবসম্মত, তেমনি বয়স হলেও কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা ইতিবাচক বলেও মনে করেন তারা।
তাদের মতে, প্রবাস জীবনে অনেক পরিবার নিজেদের বাগানে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে থাকে। বাড়তি উৎপাদন বিক্রি করে কিছু অর্থ আয় করা হলে সেটিকে নেতিবাচকভাবে দেখার কারণ নেই। বরং এটি পরিশ্রম ও স্বাবলম্বিতার দৃষ্টান্ত হতে পারে।
তবে অন্য একটি অংশ এ ধরনের দৃশ্যকে ভিন্নভাবে দেখছে। তাদের প্রশ্ন, আর্থিক প্রয়োজন কিংবা পারিবারিক চাপে প্রবীণ বাবা-মাকে দীর্ঘ সময় ফুটপাতে বসিয়ে সবজি বিক্রি করানো কতটা যুক্তিসংগত। বিশেষ করে বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাদের বিশ্রাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন অনেকে।
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের এক কমিউনিটি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘আমেরিকা বাংলা’কে বলেন, বাগানের অতিরিক্ত সবজি নষ্ট না করে বিক্রি করায় দোষের কিছু নেই। এতে পরিবারের কিছু খরচও উঠে আসে এবং উৎপাদিত খাবারেরও ব্যবহার হয়।
তবে তার মতে, প্রবীণ বাবা-মাকে প্রতিদিন রাস্তায় বসিয়ে দীর্ঘ সময় সবজি বিক্রি করানোর পরিবর্তে স্থানীয় গ্রোসারি দোকান, পরিচিত ক্রেতা কিংবা অন্য কোনো বৈধ ও সম্মানজনক মাধ্যমে এসব পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে সবজি বিক্রির কাজও হবে, আবার বয়স্কদের ওপর অতিরিক্ত চাপও পড়বে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব দৃশ্য নিয়ে অনেকেই অবশ্য সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তে যেতে চাইছেন না। কারণ প্রবীণ ব্যক্তিরা নিজের ইচ্ছায় এসব বিক্রি করছেন, নাকি পারিবারিক প্রয়োজনের কারণে করতে বাধ্য হচ্ছেন—তা স্পষ্ট নয়।
প্রবাসী জীবনে কাজের ধরন, পরিবারের আয়-ব্যয়ের চাপ এবং একাধিক প্রজন্মের সদস্যদের একসঙ্গে বসবাসের বাস্তবতা অনেক পরিবারেই ভিন্ন। ফলে বাইরে থেকে কোনো একটি দৃশ্য দেখে পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।
তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রবীণদের প্রতি পরিবারের দায়িত্ব। অনেক সচেতন প্রবাসীর মতে, কেউ কাজ করতে চাইলে তাকে সেই সুযোগ দেওয়া যেমন সম্মানের, তেমনি বয়স ও শারীরিক সামর্থ্য বিবেচনা করে কাজের ধরন ও সময় নির্ধারণ করাও জরুরি।
সব মিলিয়ে, নিউইয়র্কের রাস্তায় দেশি সবজি বিক্রির এই দৃশ্য শুধু খাবার বিক্রির ঘটনা হিসেবে থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে প্রবাসী জীবনের আর্থিক বাস্তবতা, প্রবীণদের আত্মনির্ভরতা, পরিবারের দায়িত্ব এবং সামাজিক মর্যাদার মতো বড় কিছু প্রশ্ন।
কাউকে বিদ্রূপ বা সমালোচনা করার আগে প্রবীণদের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা এবং তাদের সম্মান ও স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রেখে কীভাবে কাজের সুযোগ তৈরি করা যায়, সেটিই এখন কমিউনিটির সচেতন মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।