সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

কমিউনিটি
৩:৪৩ পিএম, ২৪ আগস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে সহিংসতার শিকার বাংলাদেশিরা, একের পর এক প্রাণহানিতে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আসা বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে সহিংসতার শিকার হওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছর দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অন্তত তিন বাংলাদেশি সহিংস হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। এসব ঘটনা আলাদা সময়, স্থান ও পরিস্থিতিতে ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে থাকা বাংলাদেশিরাই হামলার শিকার হয়েছেন। […]

যুক্তরাষ্ট্রে সহিংসতার শিকার বাংলাদেশিরা, একের পর এক প্রাণহানিতে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ মিনিটে পড়ুন |

যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আসা বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে সহিংসতার শিকার হওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছর দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অন্তত তিন বাংলাদেশি সহিংস হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। এসব ঘটনা আলাদা সময়, স্থান ও পরিস্থিতিতে ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে থাকা বাংলাদেশিরাই হামলার শিকার হয়েছেন।

চলতি বছরের এপ্রিলে ফ্লোরিডায় গ্যাস স্টেশনে কর্মরত নিলুফা ইয়াসমিন হামলায় নিহত হন। জুলাইয়ে পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় খাবার ডেলিভারি দিতে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারান মো. মাহফুজুল হক। আর সর্বশেষ নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে একটি রেস্তোরাঁয় গুলিতে নিহত হয়েছেন বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টকর্মী রাজু। একই সময়ে নিউইয়র্কে রাইড শেয়ার চালক মো. রুহুল আমিন নাসির গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। ব্রুকলিনের সাম্প্রতিক আরেক ঘটনায় রাজুর সঙ্গে থাকা বাংলাদেশি রাসেলও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

ফ্লোরিডায় গ্যাস স্টেশনে নিহত নিলুফা

এপ্রিলের শুরুতে ফ্লোরিডার ফোর্ট মায়ার্সে গ্যাস স্টেশনে কর্মরত বাংলাদেশি নারী নিলুফা ইয়াসমিন হামলার শিকার হন। ৩ এপ্রিল গ্যাস স্টেশনের বাইরে তাকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তদন্তকারীদের কাছে সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিলুফাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই সেখানে গিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেছেন—স্থানীয় তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। নিলুফা ছিলেন দুই কন্যার মা।

ঘটনার পর সন্দেহভাজন রবার্ট জোয়াচিনের বিরুদ্ধে হত্যার মামলা করা হয়েছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, প্রসিকিউশন মামলাটিতে মৃত্যুদণ্ডের আবেদনও করেছে।

ফিলাডেলফিয়ায় ডেলিভারি দিতে গিয়ে নিহত মাহফুজুল

পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় ৭ জুলাই রাতে খাবার ডেলিভারি দিতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন ৪৩ বছর বয়সী বাংলাদেশি মো. মাহফুজুল হক। কিংসেসিং এলাকার সাউথ ইথান স্ট্রিটের ১০০০ ব্লকের কাছে পুলিশ তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তার গাড়ির পাশে পড়ে থাকতে দেখে। গাড়ির ইঞ্জিন তখনও চালু ছিল এবং পাশে ছিল ডোরড্যাশের ডেলিভারি ব্যাগ।

পুলিশ জানায়, মাহফুজুলের মাথার পেছনে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকে রাইফেলের গুলির খোসাও উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীরা প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বা লক্ষ্যভিত্তিক হামলা হিসেবে বিবেচনা করেন এবং মুখোশধারী কয়েকজন সন্দেহভাজনের সন্ধান শুরু করেন। পরে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

মাহফুজুল রাজশাহীর বাসিন্দা ছিলেন। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন তিনি এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ডেলিভারি কাজ করতেন।

নিউইয়র্কে রাইড শেয়ার চালক ও রেস্টুরেন্টকর্মী হামলার শিকার

নিউইয়র্কেও বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ২৪ জুলাই ব্রুকলিনের ফোর্ট গ্রিন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন বাংলাদেশি রাইড শেয়ার চালক মো. রুহুল আমিন নাসির। যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পর তার গাড়ির সঙ্গে একটি মেডিকেল ডেলিভারি ভ্যানের সামান্য সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটি চলার সময় এক ব্যক্তি তার গাড়ির জানালার কাছে এসে খুব কাছ থেকে গুলি করে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ।

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আমিনকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তার অস্ত্রোপচার করা হয়। বর্তমানে তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন বলে জানানো হয়েছে।

এর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ব্রুকলিনে আবারও গুলির ঘটনা ঘটে। ২৩ আগস্ট মধ্যরাতে ব্রাউনসভিল এলাকার আমেরিকান বেস্ট উইংস অ্যান্ড পিজা রেস্টুরেন্টে গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টকর্মী রাজু। একই ঘটনায় ৩৯ বছর বয়সী আরেক বাংলাদেশি রাসেল গুলিবিদ্ধ হন। তার অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গেছে। ঘটনাটির তদন্ত করছে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ।

স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে, রাজু নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন এবং প্রায় তিন বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তার স্ত্রী, তিন সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যরা বাংলাদেশে রয়েছেন।

কেন বাড়ছে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অভিবাসীদের বড় একটি অংশ এমন পেশায় কাজ করেন, যেখানে সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতে হয়। রেস্টুরেন্ট, গ্যাস স্টেশন, খাবার ডেলিভারি, রাইড শেয়ার, ট্যাক্সি, ছোট ব্যবসা ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজে নিয়োজিতদের অনেককেই প্রতিদিন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়।

রাইড শেয়ার চালক ফাহাদ হোসেন বলেন, কাজের ধরন ভিন্ন হলেও এসব পেশায় নিরাপত্তার ঝুঁকি অনেকের ক্ষেত্রেই একই। তার মতে, কোনো বাংলাদেশি নিহত বা আহত হওয়ার পর কিছুদিন আলোচনা হলেও পরে বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে চলে যায়। বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষ থেকে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আরও জোরালোভাবে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।

খাবার ডেলিভারি চালক মোহাম্মদ শিরিল হাসানও বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, জীবিকার জন্য কাজ করতে বের হয়ে যদি একজন অভিবাসী নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।

শুধু শোক নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ

নিলুফা ইয়াসমিন কর্মস্থলে ছিলেন, মাহফুজুল হক খাবার পৌঁছে দিতে বেরিয়েছিলেন এবং রাজুও রেস্টুরেন্টে দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রত্যেকেরই লক্ষ্য ছিল কাজ শেষে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া। কিন্তু সহিংসতার ঘটনায় সেই স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তন আর সম্ভব হয়নি।

প্রবাসী বাংলাদেশিরা মনে করেন, এসব ঘটনার পর শুধু শোক প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। স্থানীয় পুলিশ, সিটি প্রশাসন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কমিউনিটির নেতাদের নিয়মিত যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ডেলিভারি, রাইড শেয়ার, গ্যাস স্টেশন, রেস্টুরেন্ট ও রাতের শিফটে কাজ করা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা ও সহযোগিতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কোনো বাংলাদেশি নিহত বা আহত হলে তদন্তের অগ্রগতি, সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার, বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়েও ধারাবাহিকভাবে কাজ করার দাবি উঠেছে।

কারণ প্রতিটি ঘটনার পর কয়েক দিনের আলোচনা নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগই এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ