সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

ধর্ম
৭:৩৭ এএম, ২৯ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষাঙ্গনে আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানীর অবিস্মরণীয় প্রভাব ও জীবনগাঁথা

বাংলার মাটি হাজার বছরের ইতিহাসে অসংখ্য গুণীজনের আবাস, যারা বিদেশী হলেও এই মাটির মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানী (রহ.), যিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট হাদিসবিদ, শিক্ষক ও ধার্মিক ব্যক্তি। তার জীবন ও কর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় যে আলোকবর্তিকা জ্বলে উঠেছে, তা আজও অনুপ্রেরণার উৎস। আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানীর […]

বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষাঙ্গনে আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানীর অবিস্মরণীয় প্রভাব ও জীবনগাঁথা
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

বাংলার মাটি হাজার বছরের ইতিহাসে অসংখ্য গুণীজনের আবাস, যারা বিদেশী হলেও এই মাটির মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানী (রহ.), যিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট হাদিসবিদ, শিক্ষক ও ধার্মিক ব্যক্তি। তার জীবন ও কর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় যে আলোকবর্তিকা জ্বলে উঠেছে, তা আজও অনুপ্রেরণার উৎস।

আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানীর জন্মস্থান ছিল রুশীয় তুর্কিস্থানের খোতান প্রদেশ। শৈশব থেকেই তিনি জ্ঞানের প্রতি গভীর আকর্ষণী ছিলেন। দীর্ঘ যাত্রাপথ পেরিয়ে তিনি ভারতবর্ষে এসে অবশেষে বাংলাদেশে স্থায়ী হন। তার এই হিজরতের পথ ছিল শুধু ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়; এটি ছিল এক আত্মিক যাত্রা, যেখানে সীমান্তের বাহিরে গড়ে উঠল জ্ঞানের সেতু, মানবসেবার অন্তহীন সীমানা।

তাঁর শিক্ষা ও অধ্যয়নের ক্ষেত্র ছিল বিস্তৃত—কুরআন, হাদিস, ফিকহ এবং তাসাউফের গভীরে তিনি পারদর্শী। বিশেষ করে হাদিস বিজ্ঞানে তার অবদান ছিল অনন্য। তিনি বারবার বলতেন, “হাদিস হলো ইসলামের হৃদস্পন্দন, এর আলোয় না ভিজলে জ্ঞানের শরীর কখনো সম্পূর্ণ হয় না।” এই দর্শন থেকেই তার শিক্ষা পদ্ধতি গড়ে উঠেছিল, যা ছাত্রদের জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছে।

বাংলাদেশে আসার পর তিনি দীর্ঘদিন ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীকে শিক্ষিত ও প্রেরণা দিয়েছেন। তার পড়ানোর ধরন ছিল একেবারে ব্যতিক্রমী—শিক্ষার্থীরা বলতেন, তার দরস একবার শুনলেই তা মনে থেকে যায় সারাজীবন। তিনি জ্ঞানকে শুধু মুখস্থ করার পরিবর্তে হৃদয়ে ধারণের শিক্ষা দিতেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সরল জীবনযাপনকারী। বিলাসিতার প্রতি তার ছিল একেবারেই বিরক্তি। দরিদ্র ও অসহায় ছাত্রদের সাহায্য করাই ছিল তার নিত্যকর্ম। তার বিনয়, দীননিষ্ঠতা এবং মানবপ্রেমের কারণে তিনি ছাত্র-শিক্ষকদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। তার শান্ত ও নীরব উপস্থিতি অনেকের জীবন পাল্টে দিয়েছে।

১৯৮৬ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি পরলোকগমন করেন, তবে তার শিক্ষা ও আদর্শ আজও বেঁচে আছে। প্রতি বছর তার মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাকে স্মরণ করে দোয়া ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছারছীনা, দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া, মাদারীপুর ও ঢাকার ইসলামি শিক্ষাঙ্গনে তার ছাত্ররা গর্বের সঙ্গে বলেন, “আমরা নিয়াজ খোতানীর দরসে বসেছিলাম।”

আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানীর জীবন ও শিক্ষার মূলমন্ত্র ছিল, “ইলম মানে শুধু মুখস্থ নয়, এটি আত্মার প্রশান্তি, চরিত্রের উন্নয়ন ও সমাজের কল্যাণের উৎস।” তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান যদি বিনয়ের শিক্ষা না দেয়, তাহলে তা প্রকৃত জ্ঞান নয়, বরং অহংকারের ছদ্মবেশ মাত্র।

আজ তার স্মৃতিতে আমরা এক মহৎ ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, যিনি নিজে হয়তো নিভে গেছেন কিন্তু তার জ্ঞানের আলো ও আদর্শ আজও আমাদের পথপ্রদর্শক। তার জীবন আমাদের শেখায়, শিক্ষা শুধু পাঠ নয়, এটি হৃদয়ের পরিশুদ্ধি, মনের বিনয় ও মানবতার পরিচায়ক।

আমরা প্রার্থনা করি, আল্লাহ তায়ালা যেন তার কবরে নূর বর্ষিত করেন এবং তার জ্ঞান ও আদর্শের আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রসারিত হয়। বাংলার এই পবিত্র মাটিতে আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানীর স্মৃতি চিরজীবী হোক।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ