জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বাংলাদেশের মৎস্য ও কৃষি খাতে বিশেষ সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. কু দোংইউ সম্প্রতি রোমে এফএও সদর দপ্তরে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। বৈঠকে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ শিল্পের উন্নয়ন এবং ফল রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রযুক্তিগত ও নৈতিক […]
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বাংলাদেশের মৎস্য ও কৃষি খাতে বিশেষ সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. কু দোংইউ সম্প্রতি রোমে এফএও সদর দপ্তরে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। বৈঠকে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ শিল্পের উন্নয়ন এবং ফল রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রযুক্তিগত ও নৈতিক সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের কৃষি ও মৎস্য খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বৈঠকে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। দেশটির মৎস্য আহরণ সীমাবদ্ধ রয়েছে অগভীর জলেই, যেখানে বিদেশি ট্রলাররা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরছে। এ কারণে বাংলাদেশ মৎস্য খাতে নিজের সম্পদ রক্ষার জন্য প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন, “আমাদের সমুদ্র সম্পদ রয়েছে, কিন্তু আমরা তা থেকে পুরোপুরি লাভবান হচ্ছি না।”
ফল রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনাও বিশাল। ইউনূস জানান, চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আম, কাঁঠাল ও পেয়ারা আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে ফসল সংগ্রহোত্তর সময়ে ক্ষতি কমাতে মোবাইল কোল্ড স্টোরেজের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যা ছোট কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়ক হবে। তিনি ফসল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেন।
এফএওর পরিকল্পনা ও সহযোগিতার বিস্তারিত
ড. কু দোংইউ বাংলাদেশের অর্জনকে প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশ ‘উচ্চ সাফল্য অর্জনকারী দেশ’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এফএও প্রযুক্তিগত সহায়তা, উদ্ভাবনী পদ্ধতি এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ ও ত্রিমুখী সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি ও মৎস্য খাতের উন্নয়নে অব্যাহত সহায়তা প্রদান করবে।
বিশেষ করে গভীর সমুদ্রের মাছের মজুদ নিরূপণ এবং টেকসই আহরণের জন্য এফএও চীনের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতে পরামর্শ দিয়েছে, যা বাংলাদেশের মৎস্য আহরণ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করবে।
ফল রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের নগদ ফল উৎপাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে ড. কু উল্লেখ করেন। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, ১৯৮০-এর দশকে জাপানে চীনের ফল রপ্তানির মাধ্যমে কৃষিতে বিশাল সাফল্য অর্জিত হয়েছিল, যা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল হতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি ও মৎস্য খাতের জন্য এফএওর সহযোগিতার গুরুত্ব
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবিকা উন্নয়নের জন্য কৃষি ও মৎস্য খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এফএওর প্রযুক্তিগত ও নৈতিক সহায়তা দেশের এই খাতগুলোর আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে আসতে সহায়ক হবে।
ফল রপ্তানি সম্প্রসারণে সাশ্রয়ী ও বহনযোগ্য কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের মাধ্যমে কৃষকদের ফসলের মান বজায় থাকবে এবং বাজারজাতকরণ সহজ হবে। এতে দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
বৈঠকে আগামী ২০২৬ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ২০ বছর পূর্তি উদযাপনের পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে। এফএও মহাপরিচালক বলেন, “আমরা এ উপলক্ষ্যে বিশেষভাবে উদযাপন করব।”
বৈঠকে বাংলাদেশের খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের মৎস্য ও কৃষি খাতের উন্নয়নে এফএওর সহযোগিতা দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সহায়ক হাত। গভীর সমুদ্র থেকে মাছ আহরণে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ফল রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত খুলবে। বাংলাদেশের কৃষকেরা এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে পারবে।
এফএও ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের কৃষি ও মৎস্য খাতের জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে, যা দেশের জন্য সাশ্রয়ী ও টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করবে।
সূত্র: জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), অফিসিয়াল বিবৃতি ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, রোম, ২০২৫।