বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য স্বস্তির খবর দিয়েছে পোল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় পোশাক প্রতিষ্ঠান এলপিপি। বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নতুন ক্রয়াদেশ কমানো ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থগিতের আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে প্রতিষ্ঠানটি আবারও বাংলাদেশ থেকে স্বাভাবিকভাবে পোশাক সংগ্রহের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও এলপিপি এসএ এক যৌথ বিবৃতিতে […]
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য স্বস্তির খবর দিয়েছে পোল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় পোশাক প্রতিষ্ঠান এলপিপি। বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নতুন ক্রয়াদেশ কমানো ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থগিতের আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে প্রতিষ্ঠানটি আবারও বাংলাদেশ থেকে স্বাভাবিকভাবে পোশাক সংগ্রহের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও এলপিপি এসএ এক যৌথ বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করে। বিবৃতিতে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং এলপিপি এসএর পরিচালক দোরোতা ইয়ানকোভস্কা-তোমকুভ স্বাক্ষর করেন।
রাশিয়ার ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান এফইএস রিটেইলের কাছে বাংলাদেশের কয়েকটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতার মধ্যেই এলপিপি বাংলাদেশে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদ্যোগের পর প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এফইএস রিটেইলকে ঘিরে তৈরি হওয়া তৃতীয় পক্ষের বিরোধের কারণে বাংলাদেশে এলপিপির সঙ্গে সরাসরি ব্যবসা করা ৩৫০টির বেশি পোশাক সরবরাহকারী যেন ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে।
এলপিপি স্পষ্ট করেছে, এফইএস রিটেইলের বকেয়া অর্থ পরিশোধের জন্য তারা আইনগতভাবে দায়বদ্ধ কোনো পক্ষ নয়। তবে নিজেদের আইনি অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখেই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে গঠনমূলক আলোচনায় সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিজিএমইএও স্বীকার করেছে, এফইএস রিটেইলের কাছে পাওনা অর্থের দাবিগুলো আইনগতভাবে দায়ী পক্ষের কাছেই উপস্থাপন করা উচিত। একই সঙ্গে বকেয়া অর্থ আটকে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলো যে কঠিন ব্যবসায়িক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে, সেটিও বিবৃতিতে স্বীকার করা হয়েছে।
দুই পক্ষই এ বিষয়ে বিভ্রান্তিকর বা ঢালাও প্রচার থেকে বিরত থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের মতে, এমন প্রচারণা বাংলাদেশের অন্যান্য পোশাক প্রস্তুতকারক, শ্রমিক এবং এলপিপি ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এলপিপি জানিয়েছে, বাংলাদেশে তাদের সাম্প্রতিক সোর্সিং কার্যক্রম পর্যালোচনার মূল লক্ষ্য ছিল স্থানীয় কর্মীদের সুরক্ষা, আইনি নিশ্চয়তা এবং ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই পর্যালোচনা বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ ছিল না।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ চুক্তিভিত্তিক দায়বদ্ধতা পালনের প্রতিশ্রুতিতেও কোনো পরিবর্তন আসেনি।
এদিকে এফইএস রিটেইলের কাছে বাংলাদেশের প্রায় ৪০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪ কোটি ডলার পাওনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি। তাদের অভিযোগ, এলপিপির ঢাকা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিশ্চয়তা পাওয়ার পর তারা এফইএস রিটেইলে তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছিলেন।
এই বকেয়া অর্থ নিয়ে বিরোধের জেরে গত মাসে দুটি বায়িং হাউসের মালিক এলপিপির ঢাকা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে পৃথক মামলা করেন। এরপর এলপিপির কয়েকজন কর্মকর্তার বাসায় রাতের বেলায় পুলিশের অভিযান চালানোর ঘটনাও ঘটে।
এর আগে ২১ জুলাই এলপিপি বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বায়িং হাউস মালিকদের সংগঠন বিজিবিএকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ধীরে ধীরে ক্রয়াদেশ কমানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল। পরে ৩১ জুলাই সরবরাহকারীদের পাঠানো চিঠিতে নতুন ক্রয়াদেশ ও নতুন পণ্য উন্নয়নের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়।
তবে সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে এলপিপি। ফলে বাংলাদেশের ৩৫০টির বেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সম্পর্ক অব্যাহত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হলো।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য এলপিপির সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এলপিপি বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক কিনেছে। চলতি অর্থবছরে এই আমদানির পরিমাণ প্রায় ৭৭ কোটি ডলারে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল এবং সে অনুযায়ী নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল।
এ অবস্থায় এলপিপির বাংলাদেশে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য সম্ভাব্য বড় ধরনের একটি বাণিজ্যিক ধাক্কা আপাতত এড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।