কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মেটার নতুন এআই স্মার্টগ্লাস এমনভাবে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারে, যা অনেক সময় আশপাশের মানুষ বুঝতেই পারেন না। এ কারণে শিশুদের অজান্তে ভিডিও ধারণ, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং সেই তথ্যের সম্ভাব্য অপব্যবহার […]
ছবি: সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মেটার নতুন এআই স্মার্টগ্লাস এমনভাবে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারে, যা অনেক সময় আশপাশের মানুষ বুঝতেই পারেন না। এ কারণে শিশুদের অজান্তে ভিডিও ধারণ, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং সেই তথ্যের সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে সতর্ক করছেন প্রযুক্তি ও শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত স্মার্টফোনের তুলনায় স্মার্টগ্লাস ব্যবহার করে গোপনে ভিডিও ধারণ করা অনেক সহজ। ফলে জনসমাগমস্থল, পার্ক, স্কুল কিংবা খেলাধুলার পরিবেশে শিশুদের অজান্তে ছবি বা ভিডিও ধারণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেটার ওয়্যারেবলস বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালেক্স হিমেল জানান, তিনি নিজের মেয়ের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভিডিও স্মার্টগ্লাস দিয়ে ধারণ করেছেন। তার ভাষায়, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে হাতে মোবাইল না নিয়েও মুহূর্তগুলো স্বাভাবিকভাবে উপভোগ করা সম্ভব হয়েছে।
তবে প্রযুক্তিটির এই সুবিধার পাশাপাশি সমালোচকরাও বড় ধরনের ঝুঁকির কথা তুলে ধরছেন। তাদের আশঙ্কা, অসাধু ব্যক্তিরা একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিশু বা সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্ত গোপনে ধারণ করতে পারে। যদিও রেকর্ডিংয়ের সময় স্মার্টগ্লাসে একটি ছোট এলইডি লাইট জ্বলে ওঠে, তবুও অধিকাংশ মানুষ এখনও এই সংকেত সম্পর্কে সচেতন নন।
এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে শিশুদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া বা বিকৃত কনটেন্ট তৈরির সম্ভাবনা। ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন (IWF) সতর্ক করে জানিয়েছে, বাস্তব কিংবা অনলাইনে পাওয়া শিশুদের ছবি ব্যবহার করে এআইয়ের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে আপত্তিকর ও ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের কনটেন্ট শিশুদের প্রতি যৌন আগ্রহ উসকে দিতে পারে এবং ভবিষ্যতে বাস্তব অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
পরিধানযোগ্য ক্যামেরাযুক্ত প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৩ সালে গুগল তাদের গুগল গ্লাস বাজারে আনার পরও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নজরদারির আশঙ্কায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। পরবর্তীতে সেই পণ্যটি সাধারণ ভোক্তা বাজারে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।
অন্যদিকে মেটা রে-ব্যানের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি নতুন প্রজন্মের স্মার্টগ্লাসকে আরও আকর্ষণীয় নকশা ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বাজারজাত করছে। প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ করে অভিভাবকদের লক্ষ্য করে প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের প্রচারণার অন্যতম স্লোগান—“Never Miss a Moment” বা “কোনো মুহূর্ত হাতছাড়া করবেন না।”
তবে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্কুল, নার্সারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের ক্যাম্পাসে স্মার্টগ্লাস ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করেছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মনে করছে, শ্রেণিকক্ষ ও শিশুদের কার্যক্রমের সময় গোপনে ভিডিও ধারণের ঝুঁকি প্রতিরোধে এমন পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রযুক্তিটির ইতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলে সহায়তা, আশপাশের বস্তু শনাক্ত করা, লেখা পড়ে শোনানো এবং তাৎক্ষণিক তথ্য প্রদানের মতো বিভিন্ন কাজে এআই স্মার্টগ্লাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা মূলত ব্যবহারকারীর দায়িত্ব। তবে সমালোচকদের মতে, শুধু ব্যবহারকারীর সচেতনতার ওপর নির্ভর করলে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তাদের সুপারিশ অনুযায়ী, স্মার্টগ্লাসে ভিডিও ধারণের সময় আরও স্পষ্ট দৃশ্যমান বা শব্দভিত্তিক সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করা, নতুন গোপনীয়তা আইন প্রণয়ন এবং প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও কঠোর জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, ওষুধ বা খাদ্যপণ্য বাজারে ছাড়ার আগে যেমন নিরাপত্তা যাচাই করা হয়, তেমনি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও শিশুদের নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে—এমন প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য সামাজিক ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামো থাকা উচিত। তাদের মতে, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও শিশু সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান