নিউইয়র্কে যেখানে একটি ছোট এক বেডরুমের বাসার ভাড়াই অনেকের মাসিক আয়ের বড় একটি অংশ নিয়ে নেয়, সেখানে মাত্র ৮৮১ ডলারে নিজের একটি বাসা পেয়েছেন ২৬ বছর বয়সী নাহজায়ে অলিন। আর এই বাসা পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় তিন বছর এবং জমা দিতে হয়েছে ১০০টিরও বেশি আবেদন। ব্রঙ্কনের বাসিন্দা নাহজায়ে ২০২০ সালে প্রথমবার নিউইয়র্কের সাশ্রয়ী […]
ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্কে যেখানে একটি ছোট এক বেডরুমের বাসার ভাড়াই অনেকের মাসিক আয়ের বড় একটি অংশ নিয়ে নেয়, সেখানে মাত্র ৮৮১ ডলারে নিজের একটি বাসা পেয়েছেন ২৬ বছর বয়সী নাহজায়ে অলিন। আর এই বাসা পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় তিন বছর এবং জমা দিতে হয়েছে ১০০টিরও বেশি আবেদন।
ব্রঙ্কনের বাসিন্দা নাহজায়ে ২০২০ সালে প্রথমবার নিউইয়র্কের সাশ্রয়ী আবাসন বা হাউজিং লটারিতে আবেদন করেছিলেন। একের পর এক আবেদন করেও দীর্ঘ সময় কোনো সাড়া পাননি। অবশেষে ২০২২ সালে ব্রঙ্কনের উইলিয়ামসব্রিজ এলাকায় একটি এক বেডরুমের ফ্ল্যাটের অপেক্ষমাণ তালিকায় জায়গা পান তিনি। পরের বছর, ২০২৩ সালের মে মাসে দুই বছরের চুক্তিতে সেই বাসায় ওঠেন নাহজায়ে।
তার মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৮৮১ ডলার। অথচ একই সময়ে ব্রঙ্কনে এক বেডরুমের একটি বাসার গড় মাসিক ভাড়া ছিল প্রায় ২ হাজার ২৩০ ডলার। অর্থাৎ বাজারদরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ভাড়ায় নিজের জন্য একটি বাসা পেয়েছেন তিনি।
নাহজায়ের গল্পের আরেকটি বিশেষ দিক হলো, নতুন বাসাটি তার শৈশবের বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ব্রঙ্কনেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই তরুণী পাঁচ ভাইবোনের সঙ্গে একটি এক বেডরুমের বাসায় বড় হয়েছেন। তার নতুন বাসাটি সেই পুরোনো বাড়ি থেকে মাত্র এক ব্লক দূরে।
২০১৯ সালে কলেজ শেষ করার পর পরিবারের সঙ্গে আবার বসবাস শুরু করেন নাহজায়ে। তখন থেকেই নিজের জন্য আলাদা একটি বাসা নেওয়ার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু নিউইয়র্কের বাড়িভাড়ার বাস্তবতা তার সেই পরিকল্পনাকে সহজ করে দেয়নি।
একা বাসা নেওয়া কিংবা অন্য কারও সঙ্গে বাসা ভাগ করে থাকার সম্ভাব্য খরচ দেখেই সাশ্রয়ী আবাসনের সন্ধানে হাউজিং লটারিতে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
২০২০ সালে প্রথম আবেদন করার পর ২০২২ সালে সাড়া পাওয়ার আগ পর্যন্ত ১০০টিরও বেশি আবাসনের জন্য আবেদন করেন নাহজায়ে। এর মধ্যে ব্রুকলিনের বিভিন্ন প্রকল্প থেকেও কয়েকবার সাড়া এসেছিল। কিন্তু তার ইচ্ছা ছিল ব্রঙ্কনেই থাকা।
অবশেষে সেই অপেক্ষার ফল আসে ২০২২ সালে। উইলিয়ামসব্রিজ এলাকার একটি এক বেডরুমের বাসার অপেক্ষমাণ তালিকায় জায়গা পান তিনি।
বাসাটি সম্পর্কে খবর পাওয়ার পর নাহজায়ের প্রথম ধারণা ছিল, এক বেডরুমের ফ্ল্যাটটি হয়তো তার বাজেটের বাইরে চলে যাবে। কিন্তু সরাসরি বাসাটি দেখতে গিয়ে তার ধারণা বদলে যায়।
বাসাটি পছন্দ হয়ে যাওয়ার পর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৩ সালের মে মাসে দুই বছরের চুক্তিতে সেখানে ওঠেন তিনি। নির্ধারিত মাসিক ভাড়া ৮৮১ ডলার।
এই বাসার জন্য যোগ্য হতে নাহজায়ের বার্ষিক আয় ৩৩ হাজার ৮৬ ডলার থেকে ৪৬ হাজার ৭০০ ডলারের মধ্যে থাকতে হতো। নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য ব্যাংক হিসাব, বিল, করসংক্রান্ত কাগজপত্রসহ বিভিন্ন নথি জমা দিতে হয় তাকে।
ভাড়ার পাশাপাশি ভবনটিতে বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে কাপড় ধোয়ার ব্যবস্থা, ব্যায়ামাগার এবং বিনা মূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা।
নিউইয়র্কের হাউজিং লটারি মূলত নির্দিষ্ট আয়ের সীমার মধ্যে থাকা ব্যক্তি ও পরিবারকে বাজারদরের তুলনায় কম ভাড়ায় বাসার সুযোগ দেয়। শহরের আবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাশ্রয়ী আবাসনের খরচ সাধারণত কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়।
তবে সব আবাসনের যোগ্যতার শর্ত এক নয়। কোনো বাসার জন্য আবেদনকারীর কত আয় থাকতে হবে, তা নির্ভর করে এলাকার গড় আয়, ফ্ল্যাটের আকার, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং আবেদনকারীর বার্ষিক আয়ের মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
আবেদন করলেই যে দ্রুত বাসা পাওয়া যাবে, বিষয়টি এমন নয়। একটি ফ্ল্যাটের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৫০টি আবেদন জমা পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন আবাসন সংস্থার কর্মকর্তারা।
আবেদনের সময় শেষ হওয়ার পর কাগজে জমা দেওয়া আবেদনও প্রক্রিয়ার মধ্যে যুক্ত করা হয়। এরপর আবেদনগুলো এলোমেলোভাবে বিভিন্ন দলে ভাগ করে প্রত্যেক আবেদনকারীকে একটি নম্বর দেওয়া হয়। অনলাইন আবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদনকারীরা সেই নম্বর দেখতে পারেন। সাধারণত নম্বর যত কম হয়, আবাসন পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীর অবস্থান তত এগিয়ে থাকে।
আবাসন কর্মকর্তারা আবেদনকারীদের নিজেদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে আয়সংক্রান্ত কাগজপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
নিউইয়র্কের বাসিন্দা না হলেও হাউজিং লটারিতে আবেদন করা যায়। তবে শহরে আগে থেকেই বসবাসরত আবেদনকারীরা আগে যোগাযোগ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এ ছাড়া আবেদন করার জন্য মার্কিন নাগরিক হওয়াও বাধ্যতামূলক নয়।
নতুন বাসা পাওয়ার খবর নাহজায়ের পরিবারের কাছেও ছিল বিশেষ আনন্দের। তার মা প্রথমবার মেয়ের নতুন বাসা দেখতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। বাসাটি দেখে কেঁদে ফেলেন এবং মেয়ের জন্য গর্ব প্রকাশ করেন।
নাহজায়ের জন্যও এটি শুধু একটি কম ভাড়ার বাসা পাওয়া নয়। নিজের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিউইয়র্কে একটি বাসা পাওয়া তার কাছে দীর্ঘদিনের কঠিন বাস্তবতা ছিল। এখন নিজের বাসায় পরিবার ও ভাইবোনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।
নিউইয়র্কের হাউজিং লটারিতে নাহজায়ে একা নন। নকেংজে নামের আরেক বাসিন্দাও একইভাবে সাশ্রয়ী বাসার সুযোগ পেয়েছেন।
নকেংজে ২০২০ সালে আবেদন শুরু করার পর ২০২৩ সালে একটি এক বেডরুমের ফ্ল্যাট পান। এর আগে হারলেমের একটি ছোট এক বেডরুমের বাসার জন্য তাকে মাসে প্রায় ১ হাজার ৯০০ ডলার ভাড়া দিতে হতো। হাউজিং লটারির মাধ্যমে নতুন বাসা পাওয়ার পর তার মাসিক ভাড়া নেমে আসে ৯৯৭ ডলারে।
দুই বছরের চুক্তিতে নির্ধারিত এই ভাড়ার মধ্যে ৮৫ ডলারের ইউটিলিটি সুবিধাও রয়েছে। নতুন বাসায় ব্যায়ামাগার, খেলার ঘর ও ছাদের সুবিধা আছে। কম ভাড়ার কারণে এখন ভবিষ্যতে নিজের বাড়ি কেনার জন্য অর্থ জমাতে পারছেন তিনি।
নিউইয়র্কের উচ্চ বাড়িভাড়ার মধ্যে হাউজিং লটারি তাই অনেক বাসিন্দার কাছে সাশ্রয়ী বাসা পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ হয়ে উঠেছে। তবে নাহজায়ের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, এখানে ভাগ্য খুলতে সময় লাগতে পারে। প্রথমবার আবেদন করেই সুযোগ না এলেও নিয়মিত আবেদন চালিয়ে যাওয়া, তথ্য হালনাগাদ রাখা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখাই শেষ পর্যন্ত সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।